প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
রক্তক্ষয়ী জুলাইয়ের দুই বছর: প্রাপ্তি আর প্রত্যাশার দোলাচলে আন্দোলনকারীরা
প্রীতম কান্তি গোপ ||
২০২৪ সালের জুলাইয়ের এক তপ্ত দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) প্রধান ফটক থেকে শুরু করে কোটবাড়ির মহাসড়ক পর্যন্ত এই স্লোগানগুলো যখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন বাতাসে ছিল বারুদের গন্ধ। সাধারণ একটি অধিকার আদায়ের দাবি যে এভাবে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে এবং পরবর্তীতে দেশের পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে পুরো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে, তা হয়ত শুরুর দিকে কেউ ভাবেনি। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ৫০ একরের এই ক্যাম্পাসটিই হয়ে উঠেছিল ‘রক্তাক্ত জুলাই’র ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উপকেন্দ্র।শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে। সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটার পাহাড় ভেঙে তা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরি আর ক্লাসরুম ছেড়ে ব্যানার হাতে নেমেছিলেন রাস্তায়। লক্ষ্য ছিল একটাই মেধার অবমূল্যায়ন বন্ধ করা।তবে সময়ের সাথে সাথে শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলনে যখন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক শক্তির বর্বর দমন-পীড়ন নেমে আসে, তখন তা আর শুধু 'কোটা'র ফ্রেমে বন্দি থাকেনি, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের অন্যতম অগ্রভাগে চলে আসে কুবিয়ানরা। ঢাকার বাইরে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয় কুমিল্লা। কুবিয়ানরাই প্রথম পুলিশি আক্রমণের শিকার হন। এবং সেটা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনের স্পৃহাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন।যে ক্যাম্পাস প্রতিদিন মুখরিত থাকত শিক্ষার্থীদের আড্ডা, গিটারের সুর, আর লাল-নীল বাসের চাকার আওয়াজে; সেই ক্যাম্পাস রাতারাতি রূপ নেয় এক রণক্ষেত্রে। পুলিশের টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের নানামুখী হামলা–ভয়ভীতির মুখেও দমে যায়নি কুবির শিক্ষার্থীরা। বুক পেতে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করার সেই অকুতোভয় দৃশ্যগুলো আজও দাগ কেটে আছে হাজারো মানুষের মনে।১১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক কালো এবং একই সাথে গৌরবের দিন। সেদিনই কুবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথম বর্বর পুলিশি হামলা চালানো হয়। সেই রক্তক্ষয়ী সূচনার প্রেক্ষাপট স্মরণ করে গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির অন্যতম একজন হাসান অন্তর বলেন, "২০২৪ সালের আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নেন এবং ১১ জুলাই কুবির শিক্ষার্থীরাই প্রথম পুলিশি হামলার শিকার হন।"তিনি আরও বলেন, "সরকারের সেই কঠোর ও দমনমূলক অবস্থানই মূলত আন্দোলনকে পরবর্তীতে এক দফায় রূপ দিতে বাধ্য করে এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও আন্দোলনের অনেক প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। জুলাই থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত ক্ষমতার অপব্যবহার ও বৈষম্য দূর করে দেশে চিরতরে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।"রক্ত আর সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা যেন নস্যাৎ না হয়, সেই শঙ্কা ও স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন আরেক সম্মুখসারির আরেকজন নাঈম ভূঁইয়া। আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, "জুলাই আমাদের কাছে একটা স্বপ্নের নাম, একটি পবিত্র মাস। কত শত মানুষের রক্ত এবং দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। দেশের সর্বস্তরের, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই সংগ্রামে বুক পেতে অংশ নিয়েছিল। জুলাইয়ের মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের সব ধরনের বৈষম্য দূর করা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই বিপ্লবের পর কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে জুলাইকে ভুলভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও আমরা বাংলাদেশ নিয়ে ইতিবাচক স্বপ্ন দেখি এবং বিশ্বাস করি, আগামীর বাংলাদেশ হবে প্রকৃত অর্থেই জনগণের।"সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের গুণগত পরিবর্তন এবং শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর নিয়ে নিজের দূরদর্শী মতামত তুলে ধরেছেন উম্মে হাবিবা মৌ। ক্যাম্পাস সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমার দৃষ্টিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে, তবে এখনও অনেক প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং নিজেদের মতামত প্রকাশে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী। তবে একটি নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষার্থী-বান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে এখনও ধারাবাহিকভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।"জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পর প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব হয়তো এখনও পুরোপুরি মেলেনি; ঘুষ, দুর্নীতি আর আইনশৃঙ্খলার মতো পুরোনো ক্ষতগুলো এখনও তাড়া করে ফিরছে তরুণদের। তবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ এই শিক্ষাই দিয়ে গেছে যে অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ চোখ বুজে থাকবে না। একটি গণতান্ত্রিক আবহাওয়ায় দাঁড়িয়ে কুবির শিক্ষার্থীরা আজ যেমন স্বপ্ন দেখছেন, তেমনই আছেন সতর্ক প্রহরীর ভূমিকায়। কারণ তারা জানেন, অর্জনের চেয়ে রক্তে কেনা সেই অর্জন ধরে রাখার লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন।একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই থাকে জনগণের ভোটের অধিকার তথা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক আবহাওয়া নিয়ে কথা বলেছেন খান মোহাম্মদ নাঈম। রাষ্ট্র সংস্কারের ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রধান প্রত্যাশা ছিল দেশের মানুষের মৌলিক ও সাধারণ অধিকার নিশ্চিত করা, যার জন্য একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকারের কোনো বিকল্প ছিল না। ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর দেশে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হওয়ায় জুলাইয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশাগুলো এখন ধাপে ধাপে পূরণ হতে শুরু করেছে।"স্বৈরাচারের পতন হলেও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা পুরোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী পাবেল রানা।বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, "জুলাইয়ে আমাদের মূল প্রত্যাশাই ছিল সামগ্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের। তবে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ মনে হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে এখনও অনেকটাই দূরত্ব রয়ে গেছে। আমরা চেয়েছিলাম দেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু এখনও দেখা যায়, সরকারি চাকরিতে ঘুষের লেনদেন চলছে। দুঃখজনকভাবে ৫ আগস্টের পরও এই ধারা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।"পাবেল আরো বলেন, "দেশে বর্তমানে নির্বাচিত সরকারের আমলে নতুন একটি আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। আশা করি আমাদের প্রত্যাশার অনেকটাই ধীরে ধীরে পূরণ হবে। তবে এই প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করতে হলে দেশের সাধারণ জনগণকে অবশ্যই সবসময় সতর্ক ও সোচ্চার থাকতে হবে।"অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার তাগিদ দিয়েছেন আরেক শিক্ষার্থী শাহাদাত তানভীর রাফি।বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমাদের প্রত্যাশা ছিল দেশের সব ক্ষেত্র থেকে বৈষম্য চিরতরে দূর হবে, তবে তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু, বর্তমানে দেশে অপরাধের প্রবণতা কিছুটা বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিচার ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও কার্যকর করা উচিত।"তিনি আরো বলেন, "৫ আগস্টের পর থেকে মাঠপর্যায়ে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা অনেকটাই কমে গেছে। সরকারের কাছে জোর দাবি থাকবে, এই পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক। দিনশেষে আমার একটাই প্রত্যাশা দেশের বুক থেকে সব অন্যায়-অনিয়ম দূর করে একটি সুন্দর ও সাম্যবাদী বাংলাদেশ গড়ে তোলা।"
সাধারণ সম্পাদক: মোঃ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মোঃ সেলিম রেজা (বিএ, অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক্যাম্পাস টাইমস অনলাইন