প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
শিক্ষাছুটি শেষে উধাও জবির ২৮ শিক্ষক, তাদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পাবে ৯ কোটি টাকা
ডেস্ক নিউজ ||
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বকেয়া টাকা আদায় অথবা চাকরিতে যোগদানের বিষয়ে ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। অনুপস্থিত শিক্ষকদের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাকরিতে যোগদান না করলে ছুটিকালীন সময়ে নেওয়া সব ধরনের বেতন ও বোনাস ফেরত দিতে হবে। বকেয়া আদায়ে প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত রয়েছে প্রশাসন।
বন্ড সই করেও শর্তভঙ্গ, দুই দপ্তরের ঠেলাঠেলি
রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৬৮০ জন। এর মধ্যে বর্তমানে ১৩২ জন শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে আছেন, যা মোট শিক্ষকের প্রায় ২০ শতাংশ। নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষাছুটিতে যাওয়ার সময় প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে বন্ডে স্বাক্ষর (প্রতিশ্রুতিপত্র) নেওয়া হয় যে, ছুটি শেষে তারা অবশ্যই চাকরিতে ফিরবেন। এই শর্তেই তারা ছুটিকালীন বেতন-ভাতাসহ বোনাস সুবিধা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বারবার চিঠি দেওয়ার পরও ২৮ শিক্ষক কোনো সাড়া দিচ্ছেন না।
বকেয়া টাকার সঠিক পরিমাণ জানতে চাইলে অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, সব হিসাব রেজিস্ট্রার দপ্তরে আছে। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তারা আবার অর্থ ও হিসাব দপ্তরে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, একেকজন শিক্ষকের ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত বকেয়া রয়েছে। যার মোট পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি৷ তবে নোটিশ পাঠানোর পর দু-একজন শিক্ষক অর্থ ফেরত ও চাকরি ছাড়ার সম্মতি জানিয়েছেন।
বকেয়া আদায়ে প্রশাসনের অনীহা
দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় না হওয়ার পেছনে কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করছেন খোদ রেজিস্ট্রার দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, এর আগেও অর্থ ও হিসাব দপ্তর এবং রেজিস্ট্রার দপ্তরের কর্মকর্তারা উপাচার্যদের বিষয়টি অবহিত করলেও কেউ গুরুত্ব দেননি।
এছাড়া অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভাগীয় শিক্ষকদের একাংশের অসহযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এক বিভাগীয় চেয়ারম্যান বলেন, ছুটি শেষ হলেও দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় অবস্থান করা এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইলে বিভাগের বাকি শিক্ষকরা বাধা হয়ে দাঁড়ান। ফলে একপর্যায়ে আমাকে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে হয়। শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের চেয়ে কিছু শিক্ষকদের কাছে নিজেদের সহকর্মীর স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয়।
জানা যায়, সহকারী এবং সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষকরা সাধারণত বেশি শিক্ষাছুটি গ্রহণ করেন।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, একজন সহকারী অধ্যাপক প্রতি মাসে বাড়ি ভাড়াসহ প্রারম্ভিক মূল বেতন পান ৫৫ হাজার ২৫ টাকা এবং সহযোগী অধ্যাপক পান ৭৫ হাজার টাকা। এর বাইরে বছরে দুটি বা তার বেশি বোনাস সুবিধা গ্রহণ করেন। এই হিসাবে একজন সহকারী অধ্যাপক বছরে ৬ লাখ ৬০ হাজার এবং সহযোগী অধ্যাপক বছরে ১০ লাখ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রহণ করেন। শিক্ষাছুটির নিয়মানুযায়ী, একজন শিক্ষক এমফিল বা মাস্টার্সের জন্য স্ববেতনে ২ বছর, পিএইচডির জন্য ৫ বছর এবং পোস্টডকের জন্য ১ বছর সময় পান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, একজন সহযোগী অধ্যাপক ৫ বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বেতন পান। শিক্ষাছুটিতে যাওয়ার আগে একটি নির্দিষ্ট অর্থ বন্ড হিসেবে রাখা যেতে পারে। সাক্ষী রাখার প্রক্রিয়া আরও কঠিন করা উচিত, যেন শিক্ষক ফিরে না এলে সাক্ষীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায়।
গবেষণা পরিচালক হিসেবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষকরা বিদেশে গবেষণার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করছেন, তা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সিন্ডিকেটে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এই অর্থ ফেরত আনতে হবে।
অনুপস্থিত শিক্ষকদের বকেয়া অর্থ আদায়ে প্রশাসনের তৎপরতা বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. শেখ গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি এ বিষয় কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন বলেন, শিক্ষকদের কাছে মোট পাওনা ৯ কোটি টাকা বা তারও বেশি। সব হিসাব নিখুঁতভাবে সমষ্টি করলে বকেয়া টাকার এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। সবাইকে ইতোমধ্যেই চিঠি পাঠানো হয়েছে। চাকরিতে যোগদান না করলে তাদের পুরো অর্থ ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় অর্থ আদায়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ সম্পাদক: মোঃ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মোঃ সেলিম রেজা (বিএ, অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক্যাম্পাস টাইমস অনলাইন