১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গ অ্যাড্রেসে গণতন্ত্রের একটি সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছিলেন - "জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য"। আসলে, এই সংজ্ঞাটি খুবই সহজ মনে হয়। কিন্তু জনগণের ইচ্ছা আসলে কীভাবে বোঝা যায়? জনগণের সরকার গঠন করা কীভাবে সম্ভব? আমরা প্রায়ই ভোটকেই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বলে মনে করি। কিন্তু এটা কি আসলেই ততটা সহজ? পদ্ধতি বদলালে ফলাফলও বদলাতে পারে। তাহলে আসল 'জনগণের ইচ্ছা' কোন ফলাফলকে প্রতিনিধিত্ব করে?
সবচেয়ে বেশি ভোট মানেই কি জনরায়? পৃথিবীর বড় অংশ, বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের উত্তরসূরি দেশগুলো, এখনো সবচেয়ে সরল পদ্ধতিতে নির্বাচন করে, যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি ভোট পায় সে বিজয়ী হয়, যদিও তার ভোট সংখ্যা মোট ভোটের অর্ধেকের নিচেও থাকতে পারে। "ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট" নামে এই পদ্ধতি শোনায় সহজ ও স্বাভাবিক, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যাগুলো গভীর। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইতিহাসে দেখা যায়, বহুবার একটি দল একা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে, যদিও দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটার সেই দলকে ভোটই দেয়নি এবং এটি বাংলাদেশের জন্য ও একটি কঠিন সত্য যা প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই দেখা যায়।
আরো একটা সমস্যা হচ্ছে স্পয়লার এফেক্ট। ২০০০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটা এর একটি ভালো উদাহরণ। ফ্লোরিডায় জর্জ ডব্লিউ বুশ তার সবচেয়ে নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী আল গোরের থেকে মাত্র কয়েকশত ভোটে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় প্রার্থী রাল্ফ নেইডার প্রায় এক লাখ ভোট পেয়েছিলেন সেই নির্বাচনে। জরিপে দেখা যায়, রাল্ফ নেইডারকে ভোট দেওয়া বেশিরভাগ মানুষ আল গোরকেও পছন্দ করতেন, তবে নেইডারকে ভোট দেওয়ায় এই ভোটগুলোই বুশের জয় সহজ করে দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, কাছাকাছি মতাদর্শের দুই প্রার্থী একে অপরের ভোট কেটে নেওয়ার এই প্রবণতা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে খুবই পরিচিত। এর নাম হচ্ছে দ্যুভের্জের সূত্র। এই সূত্রটি বলে, ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতি দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায় রূপ নেয়। কারণ ভোটাররা ছোট বা নতুন দলকে ভোট দিতে ভয় পায় নিজের ভোট 'নষ্ট' হবে ভেবে।
বিকল্প খোঁজার চেষ্টা
এই সমস্যাটি এড়াতে অনেক জায়গা অগ্রাধিকারভিত্তিক ভোটিং বা র্যাংকড চয়েস ভোটিং চালু করেছে। র্যাংকড চয়েস ভোটিং-এ ভোটার এক প্রার্থীকে নয়, বরং প্রার্থীদের পছন্দের ক্রমে সাজায়। সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া প্রার্থী বাদ পড়ে, বাদ পড়া প্রার্থী ভোটের দ্বিতীয় পছন্দে যায়। প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো প্রার্থী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্রে এই পদ্ধতির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০১৬ সালে মাত্র দশটি শহরে চালু ছিল, এখন পঞ্চাশের বেশি এলাকায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ পদ্ধতিতে ভোট দিচ্ছে। নিউইয়র্ক, মিনিয়াপোলিসের মতো বড় শহরও এখন তালিকায়। তবে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সতেরোটি রাজ্য আবার এই পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছে। আরেকটি পুরোনো প্রস্তাব ছিল ফরাসি বিজ্ঞানী জঁ-শার্ল দ্য বোর্দার। এখানে ভোটারদের প্রার্থীদের র্যাঙ্ক করতে বলা হবে, র্যাঙ্ক অনুযায়ী পয়েন্ট দেওয়া হবে। তবে পদ্ধতিতে দুর্বলতা আছে; যে প্রার্থী জেতার সম্ভাবনা না রাখে, এমন অতিরিক্ত প্রার্থী যোগ করলেও চূড়ান্ত ফলাফল বদলে যায়। ফরাসি বিপ্লবের সময়ের গণিতবিদ মার্কি দ্য কনদরসে পদ্ধতির দুর্বলতা দেখেন এবং বোর্দার পদ্ধতিকে 'ভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়া' বলে সমালোচনা করেন।
কনদরসে নিজে একটা বিকল্প দিলেন। কনদরসে বললেন, যে প্রার্থী সব অন্য প্রার্থীর সঙ্গে একে একে লড়াই জিতবে, সেই প্রার্থী প্রকৃত বিজয়ী হবে। কনদরসে ন্যায্য শোনালেও, কনদরসে নিজে একটি অদ্ভুত ধাঁধা দেখলেন। যদি তিনজন মানুষের পছন্দ এমন হয় যে প্রথমটি দ্বিতীয়টির চেয়ে ভালো, দ্বিতীয়টি তৃতীয়টির চেয়ে ভালো, আর তৃতীয়টি আবার প্রথমটির চেয়ে ভালো হয়, তবে এই যুক্তিতে কোনো একজন বিজয়ী নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, ন্যায্য নির্বাচনের এই স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটি নিজেই পরে ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক হানাহানির শিকার হয়ে কারাগারে প্রাণ হারায়।
দেড়শ বছর পর, ১৯৫১ সালে তরুণ অর্থনীতিবিদ কেনেথ অ্যারো এই সমস্যাকে কঠোর গাণিতিক রূপ দিলেন। কেনেথ পাঁচটি শর্ত সাজালেন। প্রতিটি শর্ত স্বতঃসিদ্ধ, তাই কেউ আপত্তি করতে পারবে না। তারপর কেনেথ অ্যারো দেখালেন, প্রার্থী তিন বা তার বেশি হলে এই শর্তগুলো একসাথে পূরণ করে এমন কোনো র্যাঙ্কিং‑ভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতি নেই। গাণিতিকভাবে কোনো ব্যক্তি একটি নিখুঁত ভোট পদ্ধতি তৈরি করতে পারে না। গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিশ্রুতি ‘প্রত্যেকের মতের সমান ওজন’ কি তাহলে আসলেই সম্ভব? ১৯৭২ সালে কেনেথ অ্যারো অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জিতেন এবং এই আবিষ্কার এতে অন্যতম ভূমিকা রাখে।
সংখ্যা যা বলে না
অ্যারোর প্রমাণ কেবল র্যাঙ্কিং-ভিত্তিক পদ্ধতির জন্যই প্রযোজ্য। রেটিং-ভিত্তিক পদ্ধতি এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ‘অ্যাপ্রুভাল ভোটিং’ তেমনি আরেকটি পদ্ধতি। ‘অ্যাপ্রুভাল ভোটিং’ পদ্ধতিতে ভোটার র্যাঙ্ক না করে, শুধু ভোটার পছন্দের প্রার্থীদের নাম দেন। ‘অ্যাপ্রুভাল ভোটিং’ পদ্ধতি নতুন নয়। শতাব্দী ধরে ভ্যাটিকানে পোপ নির্বাচনে মানুষ অ্যাপ্রুভাল ভোটিং নীতি ব্যবহার করেছে, এবং এখনো জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে সদস্যরা অ্যাপ্রুভাল ভোটিং নীতি প্রয়োগ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্গো ও সেন্ট লুইস শহর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছে; ফলাফল মিশ্র ছিল। কিছু ক্ষেত্রে ভোটাররা একাধিক প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে দ্বিধা করেছিল, প্রথম পছন্দের সুযোগ নষ্ট হওয়ার ভয় নিয়ে। নর্থ ডাকোটা রাজ্য সরকার ২০২৫ সালে আইন করে ফার্গোর সেই পরীক্ষাই আবার নিষিদ্ধ করেছে। এটিই প্রমাণ করে যে নির্বাচনী সংস্কারের পথে রাজনৈতিক বাধা কতটা শক্তিশালী।
এদিকে রাজনৈতিক আলোচনায় গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে কথা বলতে গেলে নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান এবং দলীয় সংস্কৃতি প্রায় সব সময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে, এবং এটি থাকাও উচিত। সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভি-ডেমের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলে, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বে স্বৈরতন্ত্রের সংখ্যা গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি হবে। গণতান্ত্রিক দেশ ৮৭টি, স্বৈরতান্ত্রিক দেশ ৯২টি, এবং বিশ্বে প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ স্বৈরশাসনের অধীনে বসবাস করে, অথচ আমরা বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে দেখি। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের সংকট কখনো নিয়মের বইয়ের প্রথম পাতাতেই লুকিয়ে থাকতে পারে; ভোট গণনার পদ্ধতিই কখনো কখনো সমস্যার মূল হতে পারে। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, “গণতন্ত্র সবচেয়ে খারাপ শাসন, তবে পূর্বে পরীক্ষিত সব শাসনের চেয়ে ভাল।” অঙ্কের এই কঠিন সত্যগুলো প্রায়ই বলে, গণতন্ত্র মানে শুধু একটা নির্বাচনী তারিখ পার করে দেওয়া নয়, এটা একটা চলমান প্রশ্ন: গণনার পদ্ধতিটা কি সত্যিই আমাদের কণ্ঠস্বর বহন করে, নাকি শুধু সংখ্যার এক কৌশলী খেলা হয়ে দাঁড়ায়? তবে অঙ্কের এই কঠিন সত্যগুলো গণতন্ত্র ত্যাগের কারণ না হোক, হোক নতুন করে চিন্তার কারণ।
লামিম ফাইহান উদয়
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইন্টার্ন, অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেসি ল্যাব