ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে প্রচলিত ‘সান্ধ্য আইন’ সম্পূর্ণ বাতিল, নারী শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত এবং প্রশাসনের দেওয়া কারফিউ শিথিলের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে নারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’। সংগঠনটির দাবি, সময়সীমা সামান্য বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং নিরাপত্তার নামে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধ পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব দাবি জানায় ‘অবরোধবাসিনী’।
সংগঠনটি জানায়, গত ৩০ জুলাই থেকে তারা তিন দফা দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ছাত্রী হলগুলোতে গ্রাফিতি, পোস্টারিং ও মোমবাতি মিছিলের পাশাপাশি একাডেমিক এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ এবং তাদের ভোগান্তির গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে ১২০০-এর বেশি নারী শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসহ স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরে ১০ আগস্টের সংহতি সমাবেশ থেকে সান্ধ্য আইন বাতিলের দাবিতে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় সংগঠনটি।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবির পরিবর্তে কারফিউয়ের সময় এক ঘণ্টা শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানায় ‘অবরোধবাসিনী’। সংগঠনটির দাবি, নারী শিক্ষার্থীদের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে কেবল সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা মুক্ত চলাচলের সুযোগ থাকলেও নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের পর চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এর ফলে রাতে বাইরে থেকে হলে ফেরার সময় নারী শিক্ষার্থীদের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।
‘অবরোধবাসিনী’র দাবি, শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করা নয়, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। এ জন্য ছাত্রী হল ও ক্যাম্পাসের গেটে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রহরী ও নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানায় তারা।
সংগঠনটি আরও জানায়, সান্ধ্য আইন শুধু হলের গেটে প্রবেশের সময়সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব নারী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাগত কার্যক্রমেও পড়ছে। তাদের অভিযোগ, রাত ১০টার পর হলের বাইরে থাকলে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে টিউশন, সাংবাদিকতা, একাডেমিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং জরুরি প্রয়োজনে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিধিনিষেধ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের হলের ক্যানটিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাধা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, অনাবাসিক ছাত্রীদের অনেকেই নিয়মিত ফি পরিশোধ করলেও নিজেদের হলের বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
‘নিরাপত্তার নামে বৈষম্য নয়’
প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘অবরোধবাসিনী’ জানায়, নিরাপত্তার অজুহাতে নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ছাত্রী হলের গেটে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রহরী ও নিরাপত্তাকর্মীদের সমান ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার দাবি জানায় তারা।
এ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘পুরো ঢাকা শহর বা রাতের সব জায়গার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’—এমন যুক্তির প্রসঙ্গও তুলে ধরে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, পুরো শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নয়; তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলের ভেতরে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত
প্রেস ব্রিফিংয়ে নিজেদের তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে ‘অবরোধবাসিনী’। দাবিগুলো হলো—
১. ছাত্রী হলের ‘সান্ধ্য আইন’ সম্পূর্ণ বাতিল করে নারী শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
২. বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে আবাসিক ও অনাবাসিক সব নারী শিক্ষার্থীকে যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থানের সুযোগ দেওয়া।
৩. মা-বোনসহ নারী শিক্ষার্থীদের নারী স্বজনদের ছাত্রী হলে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা।
এর আগে গত ৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে একই তিন দফা দাবি জানিয়েছিল ‘অবরোধবাসিনী’। পরে ১০ আগস্ট প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয় সংগঠনটি।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের দাবি কোনো আংশিক বা সাময়িক শিথিলতা নয়; তারা বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন সম্পূর্ণ বাতিল করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচল নিশ্চিত করতে চায়।
দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ‘অবরোধবাসিনী’। একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রতি কারফিউ শিথিলের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নারী শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।