ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
The Campus Times online

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন, আয়করে সমতার দাবি



তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন, আয়করে সমতার দাবি


ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে CHT Students Policy Forum-এর সংবাদ সম্মেলন

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত প্রত্যক্ষ নির্বাচন আয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি সব নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জাতিগত বৈষম্য দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্টস পলিসি ফোরাম (CHT Students Policy Forum)

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র মোহাম্মদ রিয়াজুল হাসান দাবিগুলো তুলে ধরেন। পরে সংগঠনের আহ্বায়ক হাবিব আল মাহমুদ দাবিগুলোর বিভিন্ন দিক ও এর পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী মোঃ শাহাদাত হোসেন ও আরিফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিক অধিকার, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, শিক্ষা, করনীতি ও সমঅধিকার নিয়ে আয়োজকদের বক্তব্য ও দাবিগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

৩৭ বছর ধরে নির্বাচন নেই

সংবাদ সম্মেলনে রিয়াজুল হাসান বলেন, ১৯৮৯ সালে ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন’-এর আওতায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়। দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদের তুলনায় এ তিনটি পরিষদ বিশেষায়িত ও স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর অধিকারী। বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে ৩০টি, রাঙামাটিতে ৩৩টি এবং বান্দরবানে ২৮টি সরকারি বিভাগ ন্যস্ত রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

তবে সংগঠনটির দাবি, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুনের পর দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছরেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সম্প্রতি গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদও জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

রিয়াজুল হাসান বলেন, জনগণের ভোট ছাড়া মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পরিষদ পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্রের আলোকে স্থানীয় ভোটার তালিকার ভিত্তিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে।

‘নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়’

জেলা পরিষদে নির্বাচন না হওয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাবিব আল মাহমুদ বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রাথমিক শিক্ষা, হাসপাতাল, মৎস্যসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে এসব পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ বাড়তে পারে এবং জনগণের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি চিকিৎসার অভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অথচ ওই অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম জেলা পরিষদের দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। তাই কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতেও জেলা পরিষদে নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন।

আয়করে জাতিগত পরিচয়ের বদলে অঞ্চলভিত্তিক মানদণ্ডের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে দ্বিতীয় দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব স্থায়ী নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান করার দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সীমিত কর্মসংস্থান, অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতা এবং তুলনামূলক বেশি জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বাস্তবতার মুখোমুখি।

সংগঠনটির দাবি, ‘আয়কর আইন, ২০২৩’-এর সংশোধিত ষষ্ঠ তফসিলের ১৯ নম্বর বিধিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর অব্যাহতির সুবিধা রাখা হলেও একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি নাগরিকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে একই ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বসবাস করেও জাতিগত পরিচয়ের কারণে কর-সুবিধায় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ধরনের ব্যবস্থা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তাঁদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর-সুবিধা নির্ধারণে জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে অভিন্ন ও অঞ্চলভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অধিকতর ন্যায়সংগত।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা নিয়েও বক্তব্য দেওয়া হয়। সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়, পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

বক্তারা বলেন, উচ্চশিক্ষা, শিক্ষাবৃত্তি, আবাসন ও বিশেষ শিক্ষা সহায়তার ক্ষেত্রে সুযোগের ঘাটতি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে দিনমজুরি, কৃষিকাজ, পরিবহন শ্রম ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো পেশায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের অংশগ্রহণ রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

এ কারণে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নির্ধারণে শুধু জাতিগত পরিচয় নয়; বরং শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, আর্থসামাজিক অবস্থা, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা এবং প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

‘পার্বত্য কোটা’ চালুর দাবি

সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সুবিধাটি শুধু ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘পার্বত্য কোটা’ হিসেবে চালু করা উচিত। এর মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।

তিন দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে সিএইচটি স্টুডেন্টস পলিসি ফোরামের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়—

১. পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে অবিলম্বে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ‘আয়কর আইন ২০২৩’-এর বৈষম্যমূলক বিধান সংশোধন করে পাহাড়ি-বাঙালি সকল নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান জারি করতে হবে।

৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সকল প্রকার জাতিগত বৈষম্য দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ প্রদান করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে একটি টেকসই, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে সরকার, সংবাদমাধ্যম ও সুশীল সমাজের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেন তাঁরা।

The Campus Times online

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন, আয়করে সমতার দাবি

প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image


ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে CHT Students Policy Forum-এর সংবাদ সম্মেলন


তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত প্রত্যক্ষ নির্বাচন আয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি সব নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জাতিগত বৈষম্য দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্টস পলিসি ফোরাম (CHT Students Policy Forum)

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র মোহাম্মদ রিয়াজুল হাসান দাবিগুলো তুলে ধরেন। পরে সংগঠনের আহ্বায়ক হাবিব আল মাহমুদ দাবিগুলোর বিভিন্ন দিক ও এর পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী মোঃ শাহাদাত হোসেন ও আরিফুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিক অধিকার, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, শিক্ষা, করনীতি ও সমঅধিকার নিয়ে আয়োজকদের বক্তব্য ও দাবিগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

৩৭ বছর ধরে নির্বাচন নেই

সংবাদ সম্মেলনে রিয়াজুল হাসান বলেন, ১৯৮৯ সালে ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন’-এর আওতায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়। দেশের অন্যান্য জেলা পরিষদের তুলনায় এ তিনটি পরিষদ বিশেষায়িত ও স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর অধিকারী। বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে ৩০টি, রাঙামাটিতে ৩৩টি এবং বান্দরবানে ২৮টি সরকারি বিভাগ ন্যস্ত রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

তবে সংগঠনটির দাবি, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুনের পর দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছরেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সম্প্রতি গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদও জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

রিয়াজুল হাসান বলেন, জনগণের ভোট ছাড়া মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পরিষদ পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্রের আলোকে স্থানীয় ভোটার তালিকার ভিত্তিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে।

‘নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়’

জেলা পরিষদে নির্বাচন না হওয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাবিব আল মাহমুদ বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো শুধু আনুষ্ঠানিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রাথমিক শিক্ষা, হাসপাতাল, মৎস্যসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে এসব পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকলে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ বাড়তে পারে এবং জনগণের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি চিকিৎসার অভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অথচ ওই অঞ্চলের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম জেলা পরিষদের দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। তাই কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতেও জেলা পরিষদে নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন।

আয়করে জাতিগত পরিচয়ের বদলে অঞ্চলভিত্তিক মানদণ্ডের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে দ্বিতীয় দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব স্থায়ী নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান করার দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সীমিত কর্মসংস্থান, অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতা এবং তুলনামূলক বেশি জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বাস্তবতার মুখোমুখি।

সংগঠনটির দাবি, ‘আয়কর আইন, ২০২৩’-এর সংশোধিত ষষ্ঠ তফসিলের ১৯ নম্বর বিধিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর অব্যাহতির সুবিধা রাখা হলেও একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি নাগরিকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে একই ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বসবাস করেও জাতিগত পরিচয়ের কারণে কর-সুবিধায় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ধরনের ব্যবস্থা সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তাঁদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কর-সুবিধা নির্ধারণে জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে অভিন্ন ও অঞ্চলভিত্তিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অধিকতর ন্যায়সংগত।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা নিয়েও বক্তব্য দেওয়া হয়। সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়, পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

বক্তারা বলেন, উচ্চশিক্ষা, শিক্ষাবৃত্তি, আবাসন ও বিশেষ শিক্ষা সহায়তার ক্ষেত্রে সুযোগের ঘাটতি থাকায় অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে দিনমজুরি, কৃষিকাজ, পরিবহন শ্রম ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো পেশায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের অংশগ্রহণ রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

এ কারণে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নির্ধারণে শুধু জাতিগত পরিচয় নয়; বরং শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, আর্থসামাজিক অবস্থা, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা এবং প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

‘পার্বত্য কোটা’ চালুর দাবি

সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সুবিধাটি শুধু ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘পার্বত্য কোটা’ হিসেবে চালু করা উচিত। এর মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।

তিন দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে সিএইচটি স্টুডেন্টস পলিসি ফোরামের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়—

১. পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে অবিলম্বে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ‘আয়কর আইন ২০২৩’-এর বৈষম্যমূলক বিধান সংশোধন করে পাহাড়ি-বাঙালি সকল নাগরিকের জন্য সমান মানদণ্ডে আয়কর নিরূপণ ও দাখিলের বিধান জারি করতে হবে।

৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সকল প্রকার জাতিগত বৈষম্য দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ প্রদান করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে একটি টেকসই, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে সরকার, সংবাদমাধ্যম ও সুশীল সমাজের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেন তাঁরা।


The Campus Times online

সাধারণ সম্পাদক: মোঃ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মোঃ সেলিম রেজা (বিএ, অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক্যাম্পাস টাইমস অনলাইন
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন, আয়করে সমতার দাবি
0:00 0:00
1.0x