ভারতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: 'জেন-জি' আন্দোলনের সামনে নতিস্বীকার মোদী সরকারের
ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের চাপে অবশেষে পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। গত শনিবার তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এর একটি পোস্টের মাধ্যমে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তৃতীয় দফার আলোচনা শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই ঘোষণা আসে, যা রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় ছড়িয়েছে।এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু জটিল কারণ। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, বিশেষত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের একাধিক ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এই ক্ষোভ আরও তীব্র রূপ নেয় যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি শুনানিতে বেকার তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্দেশ্যে অবমাননাকর মন্তব্য করেন, তাদের সঙ্গে তেলাপোকা ও সমাজের পরজীবীর তুলনা টানেন। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ও সাবেক আম আদমী পার্টির কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপক এই অপমানজনক মন্তব্যকে ইস্যু করে ব্যঙ্গাত্মক নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে "জেন-জি আন্দোলন" নামে পরিচিতি পায় এবং দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই আন্দোলন চলে। কর্মসূচি চলাকালে সহিংস সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে, যাতে অন্তত ১৮০ জন আহত হন বলে দিল্লি পুলিশের তথ্যে জানা যায়, যাদের মধ্যে ১১৮ জনই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ একাধিক বিরোধী রাজনীতিক তরুণদের সমর্থনে রাজপথে নেমে আসেন, যা আন্দোলনকে আরও বড় রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন দাবির প্রতি সরকার আশ্বাস দেওয়ার পর যন্তর মন্তরে চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আন্দোলনের সূচনাকারী অভিজিৎ দীপক শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিজয় বলতে নারাজ; তার প্রতিক্রিয়ায় পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরকার পতনের ডাকও দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিরোধী শিবির এই ঘটনাকে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরের চেষ্টা করতে পারে। এই ঘটনাকে ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে দুই ধরনের ব্যাখ্যা লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে অনেকে একে তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জি'র সংগঠিত আন্দোলনের সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে দেখছেন—যেখানে সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক, বিকেন্দ্রীভূত এক আন্দোলন প্রথাগত রাজনৈতিক দলের সহায়তা ছাড়াই একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে আরেক অংশের মূল্যায়ন হলো, এই ঘটনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা, কারণ এটি প্রমাণ করে যে সরকার তরুণ ভোটারদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ যথাসময়ে সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষত প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্য এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ যেভাবে একত্রিত হয়ে সরকারবিরোধী জনমত তৈরি করেছে, তা আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর নতুন মন্ত্রী নিয়োগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ গতিপথ। আন্দোলনকারীদের একাংশ এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে ফের রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। একইসঙ্গে বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী চাপ আরও বাড়ানোর কৌশল নিতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। সব মিলিয়ে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ শুধু একটি মন্ত্রিসভা পরিবর্তনের ঘটনা নয়—এটি তরুণ প্রজন্মের সংগঠিত শক্তি এবং প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ক্ষোভের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।লুৎফা বিনতে লতিফ শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ইন্টার্ন, ADL