মিশরে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রকে নিশানা করেছে চীনা গোয়েন্দারা
মিশরে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক, স্বার্থগোষ্ঠী ও কথিত ‘প্যারালাল ইনফ্লুয়েন্স স্ট্রাকচার’ এর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিযানের দিকে গভীর আগ্রহ নিয়ে নজর রাখছে চীন।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের জুন মাসে মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাবরি নাখনুখের গ্রেপ্তারকে বেইজিং কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে মিশরে চীনা বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করছে।
চীনের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী, প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর প্রভাব হ্রাস পেলে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও স্থিতিশীল হয়। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমে, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পায় এবং বহিরাগত শক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকিও কমে আসে।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের এককভাবে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা বজায় রাখা একটি নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক শর্ত।
চীনা নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, মিশরে সরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণই কায়রোতে পরিচালিত চীনা প্রকল্প, বিনিয়োগ এবং সেখানে কর্মরত হাজার হাজার চীনা নাগরিকের নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টি।
চীনা গোয়েন্দা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বেইজিং সবসময়ই স্থিতিশীল ও আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্র, প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক বা স্বার্থগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় মনে করে, মিশর ও বৃহত্তর অঞ্চলে স্বাধীন প্রভাববলয় ও শক্তিশালী নেটওয়ার্কগুলোর সক্রিয়তা চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব নেটওয়ার্ক বহিরাগত শক্তির প্রভাব বা প্রতিদ্বন্দ্বী গোয়েন্দা সংস্থার জন্য সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে চীন মনে করে, এমন প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হলে কায়রোতে চীনা বিনিয়োগ আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল হবে। একই সঙ্গে এটি মিশরের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে এবং বিনিয়োগ কার্যক্রমকে অধিকতর স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলবে।
চীনা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিশরের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কেবল কায়রোর জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের ধারণা, বৈধ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠা কোনো প্রভাববলয় বা নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক বিদেশি শক্তির অনুপ্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীতে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনবিদেশিদের জন্য স্মার্ট রেসিডেন্সি কার্ড বাধ্যতামূলক করল মিশর
চীনের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, মিশরে স্বার্থগোষ্ঠী, প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ও কথিত ‘প্যারালাল সিকিউরিটি স্ট্রাকচার’ দুর্বল হলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে। এতে নিরাপত্তা শূন্যতার ঝুঁকি কমবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সংকুচিত হবে।
চীনা গোয়েন্দা ও সামরিক মহলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মিশরে কর্মরত চীনা প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি। বর্তমানে মিশরের বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার চীনা কর্মী ও শত শত প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির যেকোনো অবনতি সরাসরি চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে।
চীনের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, মিশরীয় কর্তৃপক্ষের কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চীনা নাগরিকদের জন্য একটি পরোক্ষ সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি চীনের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পরস্পর-সম্পূরক হিসেবে দেখা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কৌশলগত মহল মনে করে, মিশরের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি কাজ করাই বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এর মধ্যে সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলের টেডা ইকোনমিক কো-অপারেশন জোন, আইন সুখনা শিল্পাঞ্চল, কায়রোর নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট প্রকল্প এবং বৈদ্যুতিক রেল প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও মিশরের সম্পর্ক অভূতপূর্বভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে চীন মিশরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এই বিনিয়োগ প্রবাহকে নিরাপদ রাখতে বেইজিং এমন একটি পরিবেশ চায়, যেখানে রাষ্ট্রের বাইরে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা অনানুষ্ঠানিক শক্তিকেন্দ্র ব্যবসা ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি সংকট এবং ইরান-সংক্রান্ত আঞ্চলিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীন বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহ করিডোরে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, যার মধ্যে মিশর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বেইজিংয়ের কৌশলগত মূল্যায়ন অনুযায়ী, ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোকে মিশরের সার্বভৌমত্ব, আইন এবং সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীন রাখা জরুরি। এর ফলে চীনা পণ্য, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল কোনো অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব বা অপ্রাতিষ্ঠানিক শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই পরিচালিত হতে পারবে।
সব মিলিয়ে, চীনা নীতিনির্ধারক ও গোয়েন্দা মহলের দৃষ্টিতে মিশরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ আজ ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বেইজিং বিশ্বাস করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল মিশরই ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং চীন-মিশর কৌশলগত অংশীদারিত্বের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. নাদিয়া হেলমির গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনের সারাংশ অনুবাদ করেছেন মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান