তৃণমূলের ৪৪০ কোটি রুপির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ
তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) প্রায় ৪৪০ কোটি রুপি জমা থাকা তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডেবিট কার্যক্রম (টাকা তোলার প্রক্রিয়া) ফ্রিজ বা স্থগিত করা হয়েছে। দলটির কয়েকজন বিদ্রোহী বিধায়ক এই তহবিলের উৎস নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানিয়ে অভিযোগ করার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, একটি বেসরকারি ব্যাংকে থাকা দলটির তিনটি অ্যাকাউন্ট ‘ডেবিট ফ্রিজ’-এর আওতায় আনা হয়েছে। এর অর্থ হলো, এই অ্যাকাউন্টগুলো থেকে কোনো ধরনের টাকা তোলা বা বাইরের কোনো লেনদেন করা যাবে না, তবে অ্যাকাউন্টে নতুন করে টাকা জমা বা ক্রেডিট হওয়া অব্যাহত থাকবে।
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিধানসভা নির্বাচনে দলটির পরাজয়ের পর প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং বিরোধীদলীয় নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুটি শিবিরের মধ্যে সাংগঠনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতা দখলের লড়াই চরম রূপ নিয়েছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসারী ১০ জন বিধায়ক বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার ক্রাইম থানায় এফআইআর দায়ের এবং অ্যাকাউন্টগুলো নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানান।
অভিযোগকারী বিধায়কেরা অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া বিশাল অঙ্কের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এর লেনদেন নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আবেদন করেছেন।
দায়ের করা অভিযোগের একটি কপি থেকে জানা যায়, তাঁরা তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখতে বলেছেন যে এই তহবিলগুলো বৈধ উৎস থেকে এসেছে, নাকি বিভিন্ন বেআইনি কর্মকাণ্ড যেমন—কাট-মানি সংগ্রহ, সরকারি তহবিলের অপব্যবহার বা কোনো কেলেঙ্কারি ও স্ক্যামের লভ্যাংশ থেকে এসেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য সূত্র ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে আমার নজরে এসেছে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদুপায় এবং সন্দেহজনক অবৈধ অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে অর্জিত কিছু তহবিল এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে স্থানান্তর ও জমা করা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত এক সিনিয়র বিধায়ক পিটিআইকে জানিয়েছেন, তাঁরা পুলিশের এই পদক্ষেপের কথা শুনেছেন তবে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি পাননি।
মজার বিষয় হলো, কয়েক দিন আগেই সিনিয়র টিএমসি নেতা অরূপ বিশ্বাস ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে অ্যাকাউন্টগুলোর সুরক্ষা ও লেনদেন স্থগিতের অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, দলের নেতৃত্ব সংকট বা অভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই আমানতগুলো যেন কেউ পরিচালনা করতে না পারে। তবে অরূপ বিশ্বাস যেখানে অ্যাকাউন্ট সুরক্ষার জন্য ফ্রিজ চেয়েছিলেন, সেখানে বিদ্রোহী বিধায়কেরা এখন একে পুরোপুরি অপরাধমূলক বা ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের আওতায় নিয়ে এসেছেন।
অন্যদিকে, মমতা-অনুগামী বিধায়ক কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, অরূপ বিশ্বাস এখন আর দলের কোষাধ্যক্ষ নন এবং আর্থিক বিষয়ে দলের হয়ে কথা বলার কোনো অধিকার তাঁর নেই। ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৫ জুনের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শুভাশীষ চক্রবর্তীকে নতুন কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে এবং তখন থেকে তিনিই দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনটি অ্যাকাউন্ট ডেবিট ফ্রিজ হওয়ার পর তৃণমূলের ভেতরের এই আর্থিক বিরোধ কেবল নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি পুলিশি অভিযোগ ও ফান্ডের বৈধতা নিয়ে এক বিশাল প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।