বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ বলে কিছু হয় না: এলাহাবাদ হাইকোর্ট
দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্মতিভিত্তিক সম্পর্কের পর কেবল বিয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার কারণে সেটিকে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এই পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে আদালত ট্রায়াল কোর্টে বিচারাধীন এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণসহ অন্যান্য সমস্ত ফৌজদারি কার্যধারা বা মামলা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সঞ্জয় সরোজ ওরফে সঞ্জয় কুমার নামে এক আবেদনকারীর দায়ের করা পিটিশন মঞ্জুর করে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি বিবেক কুমার সিংহের একক বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক আদেশটি পাস করেন।
ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজের (সাবেক এলাহাবাদ) কর্নেলগঞ্জ থানার। মামলার তথ্য অনুযায়ী, প্রতাপগড়ের বাসিন্দা ওই তরুণী ২০১৪ সালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়াগরাজে এসেছিলেন। সেখানে তাঁর এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় (অভিযুক্ত সঞ্জয়) পড়াশোনা এবং থাকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাঁকে সহযোগিতা করেন। এই সময়ে দুজনেই একে অপরের কাছাকাছি আসেন এবং একটি গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ওই নারী সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) ৩৭৬ (ধর্ষণ), ৩২৩, ৫০৪ এবং ৫০৬ ধারার অধীনে একটি এফআইআর দায়ের করেন। এফআইআরে অভিযোগ করা হয়—অভিযুক্ত ব্যক্তি বিয়ের প্রলোভনে তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এবং পরে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান।
তরুণীর দাবি, যখনই তিনি বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেন, তখনই অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁকে মারধর এবং হুমকি দিতেন।
তদন্ত চলাকালীন ওই নারী আরও অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে লিভ-ইন করতেন এবং ব্ল্যাকমেল করার উদ্দেশে একটি আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করেন। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন, সঞ্জয়ের আত্মীয়দের উপস্থিতিতে তাদের একটি প্রতীকী বিয়েও সম্পন্ন হয়েছিল।
পুলিশ ২০২০ সালে এই মামলায় চার্জশিট দাখিল করে এবং ২০২১ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বিষয়টিকে আমলে নেন। এরপরই পুরো মামলাটি খারিজের আবেদন জানিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিযুক্ত সঞ্জয় সরোজ।
মামলার সমস্ত নথি, উভয় পক্ষের যুক্তি এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে আদালত দেখতে পান, সম্পর্কটি সম্পূর্ণ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। তাই প্রারম্ভিকভাবেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া ওই নারীর মেডিকেল পরীক্ষায় কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায়নি।
আদালত তাদের ৩৪ পাতার দীর্ঘ রায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
প্রথমত, সম্পর্ক ভেঙে গেলেই তা ধর্ষণ নয়। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত—অর্থাৎ দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের এই সম্পর্কটি স্থায়ী হয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবারই কেবল বিয়ের প্রলোভনে নারীটি শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি দিয়েছিলেন, তা মেনে নেওয়া কঠিন।
আদালত স্পষ্ট করে বলেন, এটি একটি সম্মতিভিত্তিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল যা পরবর্তীতে তিক্ততায় রূপ নিয়েছে, কোনো প্রতারণামূলক মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মামলা এটি নয়। দীর্ঘ প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে ধর্ষণের রূপ দেওয়া আইনের চরম অপব্যবহার।
দ্বিতীয়ত, বিয়ে করার জন্য আইনি চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। হাইকোর্ট বিশেষভাবে নোটিশ করেছেন যে, এফআইআর দায়ের করার পর অভিযোগকারী নারী অভিযুক্তকেই বিয়ে করেছেন। আদালতের মতে, এটি পরিষ্কার নির্দেশ করে, মূলত অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর বিয়ের চাপ সৃষ্টি করতেই এই এফআইআর করা হয়েছিল এবং ওই নারী কেবল সঞ্জয়ের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
তৃতীয়ত, বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার ও ‘বিরল থেকে বিরলতম’ একটি ঘটনা। বিচারপতি বলেন, মামলাটি এমন এক ‘বিরল থেকে বিরলতম’ ক্যাটাগরিতে পড়ে, যেখানে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এই ফৌজদারি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া কেবল যে নিরর্থক হবে তা-ই নয়, বরং এটি বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার একটি চরম অপব্যবহার বা প্রহসন মাত্র।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায়ের সপক্ষে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের বেশ কয়েকটি ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্টের নজির টেনে আনেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘প্রমোদ সূর্যভান পাওয়ার’, ‘রবিশ সিং রানা’ এবং ‘দীপক গুলাটি’ মামলা। এই নজিরগুলোর আলোকে হাইকোর্ট ব্যাখ্যা করেন—একটি বিষয় তখনই কেবল ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে, যখন এটি প্রমাণিত হবে যে বিয়ের প্রতিশ্রুতিটি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং কেবল সেই প্রতারণার আশ্রয়েই নারীর সম্মতি আদায় করা হয়েছিল। কিন্তু এই মামলায় শুরু থেকেই অভিযুক্তের মনে প্রতারণার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
পাশাপাশি, আদালত সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত ‘ভজন লাল’ মামলার নির্দেশিকা বা গাইডের ১, ৫ এবং ৭ নম্বর ক্যাটাগরি উল্লেখ করে বলেন, এই মামলাটি সরাসরি সেই নির্দেশিকার আওতায় পড়ে। সব দিক বিবেচনা করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে প্রয়াগরাজ ট্রায়াল কোর্টে আবেদনকারী সঞ্জয় সরোজের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা ফৌজদারি মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বাতিল ও খারিজ করে দিয়েছেন।