ঢাকা    শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
The Campus Times online

ঢাবিতে (DUES) ‘Green Nexus–2026’-এর সমাপনী, দেশীয় বৃক্ষ রোপণের গুরুত্ব তুলে ধরলেন পরিবেশবিদরা

শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সঠিক প্রজাতির গাছ সঠিক স্থানে রোপণ এবং পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিদেশি বৃক্ষের পরিবর্তে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের গ্যালারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ (DUES) ও Arboriculture Centre-এর যৌথ আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘Dhaka University Green Nexus–2026’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের প্রেস নোট অনুযায়ী, পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষ সংরক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিই ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলমজাদ্দীনি আলফাসানী। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদের কর্মকর্তা এবং পরিবেশ ক্লাবের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।বৃক্ষরোপণ দিয়ে শুরু, এরপর বৃক্ষ চেনার পাঠতিন দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, পরিবেশের স্বাস্থ্য উন্নত করার অন্যতম উপায় হলো বৃক্ষরোপণ। গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।তবে শুধু গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হবে না। বক্তারা বলেন, কোন গাছ লাগানো হবে, কোথায় লাগানো হবে এবং লাগানোর পর কীভাবে গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখা হবে—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।এ জন্য বৃক্ষরোপণের তিনটি ধাপ হিসেবে সঠিক প্রজাতি নির্বাচন (Right Species Selection), সঠিক স্থান নির্বাচন (Right Space Selection) এবং রোপণের পর ব্যবস্থাপনা (Plantation Management)-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।বক্তাদের মতে, একটি শিশুকে জন্মের পর যেমন নিয়মিত পরিচর্যা ও নার্সিংয়ের মাধ্যমে বড় করতে হয়, তেমনি একটি গাছ লাগানোর পরও তার যথাযথ পরিচর্যা প্রয়োজন। শুধু গাছের সংখ্যা বাড়ালেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল হয় না; গাছটি টিকে থাকছে কি না এবং পরিবেশগত ভূমিকা রাখতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।ঢাবিতে ১৭ হাজারের বেশি বৃক্ষের তথ্যঅনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষ ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়ে পরিবেশ সংসদের গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। বক্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫৪১টি উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় ক্যাম্পাসে প্রায় ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়। এসব বৃক্ষ প্রায় ৭০টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।গবেষণায় ক্যাম্পাসে বিদেশি বৃক্ষের আধিক্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে জানানো হয়। বক্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃক্ষের প্রজাতির পাশাপাশি মোট বৃক্ষসংখ্যা বিবেচনা করলে বিদেশি প্রজাতির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।বিদেশি গাছ মানুষের চাহিদা মেটালেও পরিবেশের সব চাহিদা পূরণ করে নাঅনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকভাবে দেখা যায় এমন বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ হিসেবে আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, দেবদারু, কৃষ্ণচূড়া, ইপিল-ইপিল, রেইনট্রি, শিশু ও চাম্বলসহ বিভিন্ন গাছের উদাহরণ দেওয়া হয়।বক্তারা বলেন, বিদেশি বৃক্ষের মাধ্যমে মানুষের কাঠ ও জ্বালানি কাঠের মতো কিছু চাহিদা পূরণ হতে পারে। কিন্তু পরিবেশের চাহিদা শুধু মানুষের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।একটি পরিবেশে থাকা প্রজাপতি, মৌমাছি, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ, পাখি ও বাদুড় কোন গাছের ফুল, ফল বা পাতার ওপর নির্ভর করছে—সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাখ্যা করে বক্তারা বলেন, উদ্ভিদ হচ্ছে উৎপাদক। সূর্যের শক্তি ব্যবহার করে সবুজ উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করে এবং সেই খাদ্যের ওপর নির্ভর করে অন্যান্য প্রাণী। ফলে স্থানীয় প্রাণীজগতের খাদ্য ও আবাসস্থলের সঙ্গে দেশীয় উদ্ভিদের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তাদের মতে, মানুষের কাঠ বা জ্বালানির চাহিদা পূরণ হলেও যদি কোনো বৃক্ষ স্থানীয় প্রাণী ও কীটপতঙ্গের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারে, তাহলে শুধু সেই গাছের সংখ্যা বাড়িয়ে পরিবেশের সামগ্রিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।দেশীয় বৃক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বানএ কারণে ভবিষ্যতের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে দেশীয় বৃক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দেশে ২৫ কোটি বা ৫০ কোটি বৃক্ষ রোপণের মতো বড় কর্মসূচি নেওয়া হলেও সেখানে সঠিক প্রজাতি নির্বাচন ও সঠিক স্থানে রোপণ নিশ্চিত করতে হবে।একই গাছ সব ধরনের পরিবেশে সমানভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। সুন্দরবনের বৃক্ষ যেমন সুন্দরবনের পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত, তেমনি জলাভূমির বৃক্ষ জলাবদ্ধ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।হিজল-বরুণ বলে দিতে পারে কোনো এলাকা একসময় জলাভূমি ছিলমিঠাপানির জলাভূমির উপযোগী বৃক্ষ হিসেবে অনুষ্ঠানে হিজল, বরুণ, করচ, পিটালি ও জারুল-এর মতো প্রজাতির নাম উল্লেখ করা হয়।বক্তারা বলেন, ঢাকা শহরের কোনো এলাকায় স্বাভাবিকভাবে হিজল বা বরুণের মতো জলাভূমির গাছ দেখা গেলে সেটি ওই এলাকার অতীত পরিবেশের একটি ইঙ্গিত হতে পারে। অর্থাৎ কিছু উদ্ভিদকে পরিবেশের ‘ইন্ডিকেটর প্ল্যান্ট’ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।সুন্দরবনের গাছের রয়েছে বিশেষ অভিযোজনঅনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সুন্দরবনের উদ্ভিদ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও গোলপাতাসহ বিভিন্ন প্রজাতি সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত বলে উল্লেখ করা হয়।বক্তারা বলেন, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য জীবের গঠন, আকৃতি বা শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যে যে পরিবর্তন ঘটে তাকে অভিযোজন (Adaptation) বলা হয়। সুন্দরবনের উদ্ভিদের মধ্যেও লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের অভিযোজন রয়েছে।সুন্দরবনের কোনো কোনো উদ্ভিদের শিকড়, শ্বাসমূল, পাতার গঠনসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ওই পরিবেশে টিকে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সুন্দরবনের গাছ অন্য এলাকায় রোপণ করে শুধু বেঁচে থাকলেই সেখানে সুন্দরবনের মতো পরিবেশগত ভূমিকা তৈরি হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।বাংলাদেশের চার ধরনের বনাঞ্চলঅনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বনভূমির বৈচিত্র্য নিয়েও আলোচনা করা হয়। বক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মূলত পাহাড়ি বন, শাল বা সমতলের পত্রঝরা বন, মিঠাপানির জলাভূমির বন এবং লবণাক্ত পানির ম্যানগ্রোভ বন—এই চার ধরনের বনাঞ্চলের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।পাহাড়ি অঞ্চলের দেশীয় বৃক্ষ হিসেবে গর্জন, তেলসুর, সিভিক, বইলাম, চাপালিশ, রক্তন, রংগিল, পিতরাজ, গোদা, আসল হরিণা ও উদালসহ বিভিন্ন প্রজাতির কথা তুলে ধরা হয়।শাল বা সমতলের পত্রঝরা বনাঞ্চলের বৃক্ষ হিসেবে শাল, আমলকি, হরিতকি, বহেরা, শিমুল, উদাল, হলদু, কদম ও সাদা করইসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদাহরণ দেওয়া হয়।অন্যদিকে মিঠাপানির জলাভূমির বনাঞ্চলে হিজল, বরুণ, করচ ও পিটালির মতো গাছ এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও গোলপাতার মতো উদ্ভিদের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।‘সবুজ’ হলেই পরিবেশবান্ধব নয়অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, একটি এলাকায় অনেক গাছ থাকলেই সেটিকে পরিবেশগতভাবে আদর্শ বলা যায় না। সবুজায়ন হতে হবে পরিবেশের প্রয়োজন বিবেচনায়।কোনো গাছ মানুষকে ছায়া, কাঠ কিংবা জ্বালানি দিতে পারে; কিন্তু সেই গাছ স্থানীয় পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য ও আবাসস্থলের প্রয়োজন পূরণ করছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।ফলে বৃক্ষরোপণের সফলতা শুধু ‘কতটি গাছ লাগানো হয়েছে’ দিয়ে পরিমাপ না করে কোন প্রজাতির গাছ, কোথায় লাগানো হয়েছে, কতটি টিকে আছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যে কী ভূমিকা রাখছে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।বোটানিক্যাল গার্ডেনে হাতে-কলমে বৃক্ষ পরিচিতি‘Green Nexus–2026’-এর অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেনেও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বৃক্ষ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।বক্তারা জানান, বোটানিক্যাল গার্ডেনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা এবং শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উদ্ভিদ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।এ সময় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন গাছ সরেজমিনে দেখানো হয়। সেখানে একটি আফ্রিকান বাওবাব গাছের উদাহরণ দিয়ে বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়।টেকসই ক্যাম্পাস গড়ার প্রত্যয়তিন দিনব্যাপী ‘Dhaka University Green Nexus–2026’-এর বিভিন্ন কর্মসূচিতে বৃক্ষরোপণ, বৃক্ষ পরিচিতি, পরিবেশ সচেতনতা ও পরিবেশ আইনবিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের প্রেস নোটে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, দেশীয় গাছপালা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।সমাপনী অনুষ্ঠানের আলোচনায় উঠে আসে, বৃক্ষরোপণকে শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবেশের ধরন বুঝে সঠিক প্রজাতির বৃক্ষ নির্বাচন, উপযুক্ত স্থানে রোপণ এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে গাছকে টিকিয়ে রাখতে হবে।আয়োজকদের মতে, এভাবেই বৃক্ষরোপণ একটি সংখ্যাভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে গিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং একটি সবুজ ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গঠনের কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।

ঢাবিতে (DUES) ‘Green Nexus–2026’-এর সমাপনী, দেশীয় বৃক্ষ রোপণের গুরুত্ব তুলে ধরলেন পরিবেশবিদরা