শিক্ষার্থীদের পরিবেশ, বৃক্ষ, জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশব্যবস্থা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ (DUES) আয়োজিত ‘গ্রীন নেক্সাস’ কর্মসূচির দ্বিতীয় আয়োজন ‘Tree Identification’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ও প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি শিক্ষার্থীদের সরেজমিনে বিভিন্ন দেশীয় ও বিদেশি বৃক্ষ দেখিয়ে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য, পরিচিতি, আবাসস্থল ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা দেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, “আমরা প্রথম দিন বৃক্ষরোপণ করেছি। কেন? আমাদের পরিবেশের স্বাস্থ্যকে কিছুটা ঠিক করার জন্য। গাছ প্রকৃতিতে থাকলে পরিবেশ থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করবে এবং বিনিময়ে অক্সিজেন দেবে। এতে পরিবেশের স্বাস্থ্য কিছুটা উন্নত হবে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের কাজ হচ্ছে গাছ চেনা। গাছ চিনলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারব, কোন জায়গায় কোন গাছটি রোপণ করা যাবে।”
তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে বৃক্ষ ও অন্যান্য উদ্ভিদ এনে সংরক্ষণ করা। পাশাপাশি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের উদ্ভিদ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃক্ষের বৈচিত্র্য তুলে ধরে অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, “সম্প্রতি আমাদের গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ পাওয়া গেছে। এগুলো প্রায় ৭০টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে বিদেশি বৃক্ষের আধিক্য রয়েছে।”
বিদেশি বৃক্ষের উদাহরণ হিসেবে তিনি আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, দেবদারু, কৃষ্ণচূড়া, ইপিল-ইপিল, রেইনট্রি, শিশু ও লম্বু গাছের কথা উল্লেখ করেন।
বিদেশি বৃক্ষের আধিক্যের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, “বিদেশি বৃক্ষ দিয়ে আমাদের কাঠ ও জ্বালানির চাহিদার একটি অংশ পূরণ হতে পারে। কিন্তু পরিবেশের বিশাল একটি চাহিদা এতে পূরণ হয় না। আমাদের ভাবতে হবে—আমাদের প্রজাপতি এই গাছের ফুল খাবে কি না, মৌমাছি সেখানে যাবে কি না, পাখি সেখানে মধু বা ফল খাবে কি না, বাদুড় সেখানে বিচরণ করবে কি না, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ সেখানে আশ্রয় পাবে কি না।”
তিনি আরও বলেন, “পরিবেশে উৎপাদক ও খাদক—দুই পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করে এবং সেই খাদ্যের ওপর নির্ভর করে প্রাণীকুল। আমরা যদি এমন বিদেশি গাছ লাগাই, যেগুলোর ফুল, ফল বা পাতা আমাদের স্থানীয় প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে কাজে আসে না, তাহলে শুধু মানুষের চাহিদা পূরণ হবে; পরিবেশের চাহিদা পূরণ হবে না।”
এ কারণে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রজাতিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, সফল বৃক্ষরোপণের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, সঠিক স্থানে সঠিক গাছ রোপণ এবং রোপণের পর যথাযথ ব্যবস্থাপনা।
অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, “প্লান্টেশনের তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে সঠিক প্রজাতি নির্বাচন, দ্বিতীয়টি হচ্ছে সঠিক জায়গায় সঠিক বৃক্ষ রোপণ এবং তৃতীয়টি হচ্ছে রোপণের পর ব্যবস্থাপনা। একটি শিশুকে জন্মের পর বাঁচিয়ে রাখতে যেমন পরিচর্যা করতে হয়, গাছের ক্ষেত্রেও তেমন পরিচর্যা প্রয়োজন। এই তিনটি ধাপ ঠিকভাবে অনুসরণ করলেই বৃক্ষরোপণ সফল হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা দেশে ২৫ কোটি বা ৫০ কোটি বৃক্ষ রোপণের কথা বলি। কিন্তু সেগুলো যেন দেশীয় প্রজাতির হয়, সঠিক প্রজাতি যেন সঠিক জায়গায় রোপণ করা হয়—এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।”
বিভিন্ন এলাকার জন্য ভিন্ন প্রজাতির গাছ উপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুন্দরবনের গাছ যেমন সব জায়গায় ভালোভাবে বেড়ে উঠবে না, তেমনি জলাভূমির গাছও শুষ্ক এলাকায় রোপণ করা ঠিক হবে না।
এ প্রসঙ্গে হিজল, বরুণ, করচ, পিটালি ও জারুলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “হিজল, বরুণ বা করচের মতো গাছ পানিতে দীর্ঘসময় টিকে থাকতে পারে। তাই ঢাকা শহরের কোনো এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে যদি হিজল বা বরুণ গাছ দেখা যায়, তাহলে ধারণা করা যেতে পারে, ওই জায়গাটি একসময় জলাভূমি বা পানিতে নিমজ্জিত ছিল।”
সুন্দরবনের উদ্ভিদ সম্পর্কে তিনি বলেন, সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও গোলপাতা সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। এসব গাছ অন্য এলাকায় রোপণ করা সম্ভব হলেও সেগুলো নিজস্ব পরিবেশের মতো স্বাভাবিক বৃদ্ধি নাও পেতে পারে। কারণ প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য উদ্ভিদের বিভিন্ন ধরনের অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “অ্যাডাপটেশন হলো এমন পরিবর্তন, যা কোনো উদ্ভিদকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এই পরিবর্তন গাছের গঠন, আকৃতি বা শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যে হতে পারে।”
বাংলাদেশের বনাঞ্চলের বৈচিত্র্য তুলে ধরে অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, দেশে মূলত চার ধরনের বনভূমি দেখা যায়—পাহাড়ি বন, সমতলের শাল ও পত্রঝরা বন, মিঠাপানির জলাভূমির বন এবং লবণাক্ত পানির ম্যানগ্রোভ বন।
পাহাড়ি বনাঞ্চলের দেশীয় বৃক্ষ হিসেবে গর্জন, তেলসুর, চাপালিশ, রক্তন, পিতরাজ, গোদা, আসন, হরিণা ও উদালসহ বিভিন্ন প্রজাতির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সমতলের শাল ও পত্রঝরা বনাঞ্চল সম্পর্কে তিনি বলেন, এ অঞ্চলে শাল প্রধান বৃক্ষ। এর সঙ্গে আমলকি, হরিতকী, বহেরা, শিমুল, উদাল, হলদু, কদম, সাদা করই ও গাদিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে।
অন্যদিকে, জলাভূমির বনাঞ্চলে হিজল, বরুণ, করচ ও পিটালির মতো গাছের উপস্থিতি বেশি। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া ও গোলপাতা।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদের সভাপতি শেখ রাশেদুজ্জামান বলেন, “আমরা প্রায়ই পরিবেশ রক্ষার কথা বলি এবং গাছ লাগানোর কথা বলি। কিন্তু শুধু গাছ লাগালেই হবে না। আমাদের জানতে হবে আমরা কী গাছ লাগাচ্ছি এবং সেই গাছের পরিবেশগত গুরুত্ব কী। একটি গাছকে চেনা মানে শুধু তার নাম জানা নয়। একটি গাছের সঙ্গে পাখি, প্রজাপতি, কীটপতঙ্গ, মাটি এবং পুরো ইকোসিস্টেমের সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে প্রকৃতিকে চিনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “Tree Identification-এর মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। আমরা চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ে পরিবেশ সম্পর্কে জানবে না, বরং নিজেদের চারপাশের গাছপালা ও জীববৈচিত্র্যকে চিনবে এবং সংরক্ষণের দায়িত্বও নেবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ কামাল অনিক বলেন, “পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু পরিবেশবিদদের নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্বের শুরু হতে পারে খুব ছোট একটি জায়গা থেকে—আমাদের চারপাশের একটি গাছকে চেনার মাধ্যমে।”
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদের কর্মকর্তা ও সদস্যরা এবং পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রমে যুক্ত শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। পরে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে গাছ শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
আয়োজকদের মতে, ‘গ্রীন নেক্সাস’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করা নয়, বরং গাছের প্রজাতি, আবাসস্থল, জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।