ঢাবি প্রতিনিধি
ধর্মীয় পোশাক ও পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের বৈষম্য ও হয়রানি ঠেকাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্পষ্ট আচরণবিধি এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস সোসাইটি (HRDS), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মো. তারিফ আহাম্মেদ তুহিন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরিহিত এক নারী শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গি’ বলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটি এ বিবৃতি দেয়।
বিবৃতিতে HRDS বলেছে, কোনো শিক্ষার্থীর পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাকে হেয়, অপমান কিংবা বৈষম্যের শিকার করা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ নিয়ম ও একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে একজন শিক্ষার্থীর পোশাক ও ধর্মীয় অনুশীলন তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ধর্মীয় অধিকারের অংশ।
সংগঠনটির দাবি, নিকাব, হিজাব, বোরকা কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা প্রয়োজন, যাতে একদিকে শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে পরীক্ষা, ভাইভা বা পরিচয় শনাক্তকরণের মতো একাডেমিক প্রয়োজনও যথাযথভাবে পূরণ করা যায়।
HRDS বিশেষভাবে পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্তকরণের প্রয়োজন থাকলেও সেটি যেন অপমানজনক, বৈষম্যমূলক বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ্য কোনো প্রক্রিয়ায় না করা হয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুস্পষ্ট প্রটোকল থাকা উচিত।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নিকাব পরিহিত শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গি’ বলার অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযোগটি সত্য হলে তা ওই শিক্ষার্থীর মর্যাদা ও সুনাম ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি তার জন্য বৈষম্যমূলক ও বৈরী একাডেমিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই অভিযোগকারী শিক্ষার্থী, অভিযুক্ত শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের সম্ভাব্য অডিও-ভিডিওসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্ত শিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত না করার আহ্বান জানিয়েছে HRDS। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক, সাংগঠনিক বা মতাদর্শিক পরিচয় তদন্তের ফলাফলকে প্রভাবিত করা উচিত নয়।
বিবৃতিতে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের পর ইংরেজি বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানিয়েছে। HRDS এটিকে তদন্তকালীন একাডেমিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্য সমান অধিকার
HRDS বলেছে, মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক অবস্থান, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা মতাদর্শের ভিত্তিতে ভিন্ন আচরণ করা উচিত নয়। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি অভিযুক্ত শিক্ষকের ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো শিক্ষার্থী যেন হয়রানি, প্রতিহিংসা, একাডেমিক ক্ষতি বা সামাজিক চাপের শিকার না হন। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী আচরণ বিষয়ে সচেতনতামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এইচআরডিএস-এর ভাষ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বহুমত, বহুবিশ্বাস ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাঙ্গন। তাই এখানে ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস, পোশাক ও জীবনাচরণে অভ্যস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য সমান মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংগঠনটি বলেছে, কোনো অভিযোগের বিচার রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব পক্ষের অধিকার নিশ্চিত করে বিষয়টির দ্রুত ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি করবে বলে প্রত্যাশা জানিয়েছে এইচআরডিএস।