আজ সোমবার বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। এ সময় ছাত্রীদের চলাচল ও হলে প্রবেশ সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধি–নিষেধকে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য হেমা চাকমা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাত জাহান ইমু এবং ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সহসভাপতি সীমা আক্তারসহ অন্যান্যরা।
‘অবরোধবাসিনী’র পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—ছাত্রী হলের রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলমান সান্ধ্য আইন অবিলম্বে বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সব নারী শিক্ষার্থীর ২৪ ঘণ্টা অবাধ যাতায়াত ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে অনাবাসিকসহ সব ছাত্রীকে যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশের সুযোগ এবং যথাযথ অনুমতি নিয়ে রাত্রিযাপনের অধিকার দেওয়া; মা-বোনসহ নারী শিক্ষার্থীদের সব নারী স্বজনের হলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু সদস্য হেমা চাকমা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সমান অধিকার, মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও অবাধ চলাচলের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান নিয়ম ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই নারী শিক্ষার্থীরা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাত জাহান ইমু বলেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নিয়মিত ফি পরিশোধ করলেও অনাবাসিক অনেক ছাত্রী নিজেদের হলে প্রবেশের সুযোগ পান না।
ইমু বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে রাতে হলে প্রবেশের সময়সীমা নির্ধারণ করায় নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি, অপমানজনক জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রশাসনিক ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষেত্রে ক্লাস শেষে নিজেদের হলের ক্যানটিনে খাবার খেতেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
ছাত্র ফেডারেশনের নেত্রী সীমা আক্তার বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সারা দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি এখানেই নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে গ্রামীণ এলাকার নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হবে?’
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দাবিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রী হলে প্রতিবাদী গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। পাশাপাশি হল ও বিভিন্ন অনুষদে প্রচারণামূলক বুথ স্থাপন করে ৬০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। এ সময় নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ভোগান্তি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।
সংগৃহীত অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরে ‘অবরোধবাসিনী’ জানায়, অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে রেখে গভীর রাতে হলে ফিরেও কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রবেশের সুযোগ পাননি। দূরপাল্লার ভ্রমণ বা জরুরি প্রয়োজনে রাতে ঢাকায় পৌঁছে অনেককে ভোর ৬টা পর্যন্ত হলের তালাবদ্ধ ফটকের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময় তারা নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া অসুস্থ সহপাঠীকে নিয়ে রাতে বাইরে থাকতে হওয়া, শিক্ষাসফর শেষে দেরিতে ফেরার অনুমতি নিতে গিয়ে অপমানজনক আচরণের শিকার হওয়া এবং অনুমতিপত্র ছিঁড়ে ফেলার মতো ঘটনার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির দাবি, এসব ঘটনা নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল, নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।
আগামী ৬ আগস্ট সংগৃহীত গণস্বাক্ষর ও স্মারকলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে বলে জানান আয়োজকেরা। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সর্বাত্মক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে। একই সঙ্গে দাবিগুলো বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এক থেকে দুই দিনের সময়সীমা দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, আবাসিক ও অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীসহ সচেতন শিক্ষার্থীদের পরবর্তী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর আরোপিত বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধের অবসানে চলমান আন্দোলনকে সফল করারও আহ্বান জানান আয়োজকেরা।