ঢাকা    শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
The Campus Times online

ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, এটি বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের মিলনেরও একটি বড় ক্ষেত্র। কিন্তু কখনো কখনো এই আবেগের জায়গাতেই উঠে আসে বর্ণবাদ, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিদ্রূপের মতো নেতিবাচক বিষয়। এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন স্পেনের তরুণ ফুটবল তারকা লামিনে ইয়ামাল। প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া একটি ধর্মীয় বিদ্রূপাত্মক স্লোগানের পর তিনি নিজের পরিচয় আড়াল না করে গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেন— ‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ।’

‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি মুসলিম’— ধর্মীয় বিদ্রূপে লামিনে ইয়ামালের দৃঢ় প্রতিবাদ



‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি মুসলিম’— ধর্মীয় বিদ্রূপে লামিনে ইয়ামালের দৃঢ় প্রতিবাদ
লামিনে ইয়ামাল ছবি: এএফপি

ঘটনার সূত্রপাত

গত ৩১ মার্চ ২০২৬ বার্সেলোনার আরসিডিই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত স্পেন ও মিশরের মধ্যকার প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। দুই দলের পারফরম্যান্স ছিল বেশ কাছাকাছি। তবে ম্যাচকে ঘিরে স্পেনের কিছু সমর্থকের আচরণ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। ম্যাচ দেখতে আসা কয়েকজন স্প্যানিশ সমর্থক মিশরীয় খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে একটি স্লোগান দিতে থাকে—

যার অর্থ— ‘যে লাফাবে না বা ভালো খেলতে পারবে না, সে মুসলিম।’

স্প্যানিশ ফুটবল সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে ‘যে লাফাবে না, সে…’ ধরনের ছড়া বা স্লোগান দেওয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। তবে ওই ঘটনায় সমালোচনার কারণ ছিল— মিশরের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বিদ্রূপ করতে তাদের মুসলিম পরিচয়কে ব্যবহার করা।

সমর্থকেরা হয়তো এটিকে শুধুই প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, যে দলের সমর্থনে তারা এই স্লোগান দিচ্ছে, সেই স্পেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় লামিনে ইয়ামাল নিজেই একজন গর্বিত মুসলিম।

তাই ‘মুসলিম’ শব্দটিকে বিদ্রূপ হিসেবে ব্যবহার করা শুধু মিশরীয় খেলোয়াড়দের নয়, ইয়ামালের নিজের পরিচয়ের প্রতিও অসম্মান হিসেবে ধরা পড়ে।

ইয়ামালের জবাব— ‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ’।

ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ১ এপ্রিল ২০২৬, ইয়ামাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি নিজের মুসলিম পরিচয় গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে লেখেন—

‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল স্টেডিয়ামে আমরা শুনেছি স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল— ‘যে লাফাবে না সে মুসলিম’। আমি জানি, এটি প্রতিপক্ষ দলকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে আমাকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমার কাছে এটি অত্যন্ত অসম্মানজনক। এমন আচরণ আমরা মেনে নিতে পারি না।’

ইয়ামাল আরও লেখেন, ‘আমি বুঝি, সব সমর্থক এমন নন। তবে যারা এই ধরনের স্লোগান দিয়েছেন, তাদের বলব— ফুটবল স্টেডিয়ামে মানুষকে উপহাস করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা আপনাদের অজ্ঞতা ও বর্ণবাদী মানসিকতার পরিচয় দেয়।’

তিনি ফুটবলের প্রকৃত চেতনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ফুটবল উপভোগ ও ভালোবাসার জায়গা। কার পরিচয় কী বা কে কোন বিশ্বাস ধারণ করে, তা নিয়ে অপমান করার জায়গা নয়।’

ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে একটি বার্তা

লামিনে ইয়ামালের এই প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ছিল না; বরং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাড়তে থাকা ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান হিসেবে দেখা হয়।

তিনি দেখিয়েছেন, নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেও একজন ক্রীড়াবিদ বিশ্বমঞ্চে সফল হতে পারেন।

ইয়ামাল কখনোই তার মুসলিম পরিচয় গোপন করেননি। পেশাদার ফুটবলের কঠোর অনুশীলন, ব্যস্ত সূচি ও শারীরিক চাপের মধ্যেও তিনি রমজান মাসে রোজা পালনের বিষয়টি আগেও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।

ধর্মীয় পরিচয় ও খেলাধুলার সম্মান

মিশরের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই স্লোগান মূলত একটি নির্দিষ্ট দলকে লক্ষ্য করে হলেও এর মধ্যে থাকা ধর্মীয় বিদ্রূপ অনেকের কাছেই আপত্তিকর হয়ে ওঠে। ইয়ামাল সেই জায়গাতেই মনে করিয়ে দিয়েছেন— খেলাধুলার মাঠে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু ঘৃণা, বিদ্বেষ বা কোনো মানুষের বিশ্বাসকে অপমান করার স্থান সেখানে হওয়া উচিত নয়।

লামিনে ইয়ামালের ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম’— এই বক্তব্য শুধু তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রকাশ নয়; এটি সম্মান, সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা। ফুটবল বিশ্বের কোটি মানুষের আবেগের জায়গা। এই আবেগ যেন কখনো বিদ্বেষে পরিণত না হয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করে— ইয়ামালের প্রতিবাদ সেই প্রত্যাশাকেই সামনে তুলে ধরেছে।

বিষয় : ইসলাম লামিন ইয়ামাল মুসলিম

The Campus Times online

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬


‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি মুসলিম’— ধর্মীয় বিদ্রূপে লামিনে ইয়ামালের দৃঢ় প্রতিবাদ

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬

featured Image


ঘটনার সূত্রপাত

গত ৩১ মার্চ ২০২৬ বার্সেলোনার আরসিডিই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত স্পেন ও মিশরের মধ্যকার প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। দুই দলের পারফরম্যান্স ছিল বেশ কাছাকাছি। তবে ম্যাচকে ঘিরে স্পেনের কিছু সমর্থকের আচরণ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। ম্যাচ দেখতে আসা কয়েকজন স্প্যানিশ সমর্থক মিশরীয় খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে একটি স্লোগান দিতে থাকে—

যার অর্থ— ‘যে লাফাবে না বা ভালো খেলতে পারবে না, সে মুসলিম।’

স্প্যানিশ ফুটবল সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে ‘যে লাফাবে না, সে…’ ধরনের ছড়া বা স্লোগান দেওয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। তবে ওই ঘটনায় সমালোচনার কারণ ছিল— মিশরের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বিদ্রূপ করতে তাদের মুসলিম পরিচয়কে ব্যবহার করা।

সমর্থকেরা হয়তো এটিকে শুধুই প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, যে দলের সমর্থনে তারা এই স্লোগান দিচ্ছে, সেই স্পেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় লামিনে ইয়ামাল নিজেই একজন গর্বিত মুসলিম।

তাই ‘মুসলিম’ শব্দটিকে বিদ্রূপ হিসেবে ব্যবহার করা শুধু মিশরীয় খেলোয়াড়দের নয়, ইয়ামালের নিজের পরিচয়ের প্রতিও অসম্মান হিসেবে ধরা পড়ে।

ইয়ামালের জবাব— ‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ’।

ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ১ এপ্রিল ২০২৬, ইয়ামাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি নিজের মুসলিম পরিচয় গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে লেখেন—

‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল স্টেডিয়ামে আমরা শুনেছি স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল— ‘যে লাফাবে না সে মুসলিম’। আমি জানি, এটি প্রতিপক্ষ দলকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে আমাকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমার কাছে এটি অত্যন্ত অসম্মানজনক। এমন আচরণ আমরা মেনে নিতে পারি না।’

ইয়ামাল আরও লেখেন, ‘আমি বুঝি, সব সমর্থক এমন নন। তবে যারা এই ধরনের স্লোগান দিয়েছেন, তাদের বলব— ফুটবল স্টেডিয়ামে মানুষকে উপহাস করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা আপনাদের অজ্ঞতা ও বর্ণবাদী মানসিকতার পরিচয় দেয়।’

তিনি ফুটবলের প্রকৃত চেতনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ফুটবল উপভোগ ও ভালোবাসার জায়গা। কার পরিচয় কী বা কে কোন বিশ্বাস ধারণ করে, তা নিয়ে অপমান করার জায়গা নয়।’

ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে একটি বার্তা

লামিনে ইয়ামালের এই প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ছিল না; বরং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাড়তে থাকা ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান হিসেবে দেখা হয়।

তিনি দেখিয়েছেন, নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেও একজন ক্রীড়াবিদ বিশ্বমঞ্চে সফল হতে পারেন।

ইয়ামাল কখনোই তার মুসলিম পরিচয় গোপন করেননি। পেশাদার ফুটবলের কঠোর অনুশীলন, ব্যস্ত সূচি ও শারীরিক চাপের মধ্যেও তিনি রমজান মাসে রোজা পালনের বিষয়টি আগেও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।

ধর্মীয় পরিচয় ও খেলাধুলার সম্মান

মিশরের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই স্লোগান মূলত একটি নির্দিষ্ট দলকে লক্ষ্য করে হলেও এর মধ্যে থাকা ধর্মীয় বিদ্রূপ অনেকের কাছেই আপত্তিকর হয়ে ওঠে। ইয়ামাল সেই জায়গাতেই মনে করিয়ে দিয়েছেন— খেলাধুলার মাঠে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু ঘৃণা, বিদ্বেষ বা কোনো মানুষের বিশ্বাসকে অপমান করার স্থান সেখানে হওয়া উচিত নয়।

লামিনে ইয়ামালের ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম’— এই বক্তব্য শুধু তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রকাশ নয়; এটি সম্মান, সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা। ফুটবল বিশ্বের কোটি মানুষের আবেগের জায়গা। এই আবেগ যেন কখনো বিদ্বেষে পরিণত না হয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করে— ইয়ামালের প্রতিবাদ সেই প্রত্যাশাকেই সামনে তুলে ধরেছে।


The Campus Times online

সাধারণ সম্পাদক: মোঃ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মোঃ সেলিম রেজা (বিএ, অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক্যাম্পাস টাইমস অনলাইন
‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি মুসলিম’— ধর্মীয় বিদ্রূপে লামিনে ইয়ামালের দৃঢ় প্রতিবাদ
0:00 0:00
1.0x