ঢাকা    মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩
The Campus Times online

ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে। এই সময়টাতে বাংলাদেশে রাত কখনো শুধু রাত থাকে না। ঘুমন্ত শহরের ভেতরেও তখন টেলিভিশনের আলো জ্বলে।

মেসির শেষ বিশ্বকাপে আবার রাত জাগবে বাংলাদেশ



মেসির শেষ বিশ্বকাপে আবার রাত জাগবে বাংলাদেশ
ছবি- এএফপি

ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে। এই সময়টাতে বাংলাদেশে রাত কখনো শুধু রাত থাকে না। ঘুমন্ত শহরের ভেতরেও তখন টেলিভিশনের আলো জ্বলে। চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে। যেদিকেই তাকাবেন কোথাও না কোথাও নীল-সাদা পতাকা দেখবেনই। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না কিন্তু বিশ্বকাপ এলে আমরা যেন অন্য এক মানচিত্রে ঢুকে পড়ি। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার রঙে ভাগ হয়ে যায় পাড়া, পরিবার, বন্ধুমহল, অফিস, ক্যাম্পাস, চায়ের দোকান।

এই বিশ্বকাপে সেই পুরোনো আবেগ আবার ফিরছে। কারণ মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনা তাদের বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে। ম্যাচটি হবে ক্যানসাস সিটিতে। ম্যাচের সময় ১৭ জুন ০১:০০ ইউটিসি। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা। অর্থাৎ এবার আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ দেখতে আমাদের রাতভর জেগে থাকতে হবে না। কিন্তু মেসির বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। তার আগে রয়েছে অনেক প্রস্তুতি। নতুন জার্সি কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, কিছু পুরনো পরিসংখ্যান ঘেঁটে নেওয়া, আগেভাগে সব কাজ সেরে রাখা। এসব মিলেই এক ধরনের রাতজাগা উৎসব। এই উৎসবের কেন্দ্রে একজন মানুষ। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

কয়েক দিনের মধ্যেই ৩৯ এ পা দেবেন মেসি। বলাই বাহুল্য, ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ প্রান্তে রয়েছেন এই ফুটবল জাদুকর। তবে মাঠে মেসির উপস্থিতি এখনো ফুটবলের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি। ২০০৬ সালে যে কিশোর মেসিকে বিশ্বকাপ প্রথম দেখেছিল ২০২৬ সালে সেই মানুষটি নামছেন রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে। ফুটবলে আরো অনেক তারকা আছে। কিন্তু একজন ফুটবলারের সাথে ভক্তদের এমন দীর্ঘ আবেগের সম্পর্কের উদাহরণ খুব কম। বাংলাদেশের ভক্তদের সাথে মেসির সম্পর্কটা আরো প্রগাঢ়। সেটা কেবল ফুটবলীয় নয়- ব্যক্তিগতও বটে।

আমাদের অনেকেই বেড়ে উঠেছি মেসিকে দেখে। রাতের পর রাত কেটেছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল তর্ক করে। প্রথম বেতন দিয়ে কিনেছি মেসির জার্সি। বাংলাদেশে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, মেসি আমাদের জীবনের সাথে মিশে থাকা একটা নাম যার সাথে আমরা বড় হয়েছি। 

২০১৪ সালের মারাকানার কান্না বাংলাদেশের অনেক ঘরে পৌঁছেছিল। সেদিন জার্মানির কাছে হেরে মেসি ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন। সেই ছবি যেন এক অসম্পূর্ণ কবিতার মতো থেকে গিয়েছিল কোটি মানুষের স্মৃতিতে। তারপর এল ২০২২। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য ফাইনাল। ৩-৩, টাইব্রেকার, এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেভ, আর শেষে মেসির হাতে বিশ্বকাপ। যে মানুষটি প্রায় দুই দশক ধরে অপেক্ষা করছিলেন, তিনিই অবশেষে ট্রফি তুললেন। সেদিনও আমরা কেঁদেছি। এবার আনন্দে। বাংলাদেশে তখন রাত ছিল না, দিন ছিল না- ছিল শুধু নীল-সাদা আনন্দ।

কিন্তু এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আবেগ একটু আলাদা। এবার আর্জেন্টিনা শুধু বিশ্বকাপ খেলছে না তারা শিরোপা রক্ষার মিশনে নেমেছে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুইবার পুরুষদের বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আর্জেন্টিনার সামনে তাই ইতিহাসের কঠিন দরজা। স্কালোনির দল ২০২২ সালের অনেক চেনা মুখ নিয়েই এসেছে। মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, রোমেরো, দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজরা আছেন। আবার নতুন প্রজন্মের কয়েকজনও আছে যারা হয়তো মেসির পরের আর্জেন্টিনার গল্প লিখবে। তবে বাংলাদেশের চোখ থাকবে মেসিতে।

কারণ মেসি যখন বল পায়ে নেন তখন ফুটবলটা কিছুক্ষণের জন্য ধীর হয়ে যায়। তিনি সব সময় দৌড়ে ম্যাচ জেতান না। তিনি কখনো হাঁটেন, কখনো দেখেন, কখনো অপেক্ষা করেন। তারপর হঠাৎ বলটা পেয়ে যান। এরপরই নেন একটা টার্ন, চোখের পলকে ফাঁক গলে বের হয়ে যান। বাম পায়ের স্পর্শে পুরো মাঠের মানে বদলে দেন। নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা অনেক গতি দিয়ে খেলেন। অনেক শক্তি দিয়ে খেলেন। কিন্তু মেসির খেলায় এখনো একটা পুরনো দিনের শিল্প আছে। তিনি যেন ফুটবলের শেষ বড় কবিদের একজন।

বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ভালোবাসার ইতিহাসও দীর্ঘ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপ এই দেশে আর্জেন্টিনা-আবেগের বড় ভিত্তি তৈরি করেছিল। তারপর মেসি সেই আবেগকে নতুন প্রজন্মের কাছে নিয়ে এসেছেন। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা যখন নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে মেসিকে দেখার জন্য বাংলাদেশে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল তা এখনো অনেকের স্মৃতিতে আছে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভালোবাসা এতটাই আলোচিত হয় যে ৪৫ বছর পর ঢাকায় আবার আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু হওয়ার ঘটনাতেও এই ফুটবল-আবেগকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এটাই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। এখানে মেসি কখনো শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নন। তিনি রংপুরের কোনো চায়ের দোকানের পোস্টার, পুরান ঢাকার কোনো ছাদের পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রাতজাগা আড্ডা, ছোট্ট শিশুর নীল-সাদা জার্সি, আর অফিস শেষে ক্লান্ত মানুষের ভোরবেলার অপেক্ষা।

এই বিশ্বকাপ হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো নয়। ফুটবল কখনো নিশ্চিত কথা বলে না। কিন্তু বয়স, সময়, শরীর, ইতিহাস- সব মিলিয়ে আমরা জানি এবারের বিশ্বকাপই হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। ২০২২ সালের মেসিকে আমরা দেখেছিলাম পূর্ণতার পথে। ২০২৬ সালের মেসিকে আমরা দেখছি বিদায়ের আলোয় দাঁড়িয়ে। তিনি জিতবেন নাকি জিতবেন না, গোল পাবেন নাকি পাবেন না, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারবে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত- বাংলাদেশ আবার মেসির জন্য অপেক্ষা করবে। 

কারণ মেসি আমাদের অনেক রাত জাগিয়েছেন। অনেক হতাশা দিয়েছেন। অসম্ভব আনন্দও দিয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন বারবার হারলেও গল্প শেষ হয় না। ২০১৪ সালের কান্না ২০২২ সালের হাসিতে বদলে যেতে পারে। নীরব স্বভাব আর অল্প কথার মানুষও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে সবচেয়ে বড় উত্তর দিতে পারেন। মেসির ক্যারিয়ারটা তাই কেবল প্রতিভার গল্প নয়। মেসির গল্পটা অপেক্ষা, ধৈর্য, বিনয় আর অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করার।

বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কখনো বুয়েনস আইরেস দেখেনি। রোসারিওর পথ চেনে না। আর্জেন্টিনার ভাষা জানে না। তবু মেসি গোল করলে এই দেশে মানুষ চিৎকার করে ওঠে। আর্জেন্টিনা হারলে আমাদেরও মন খারাপ হয়। মেসি হাঁটলে কেউ ভাবে তিনি ক্লান্ত কি না। মেসি হাসলে মনে হয় নিজের ঘরের কেউ ভালো আছে।

এই অনুভূতির কোনো নাম নেই। কোনো মানে নেই। 

তাই আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ নয়। এটি বাংলাদেশের মেসি-অধ্যায়ের আরেকটি সকাল। রাতভর না জাগলেও, আবেগে জেগে থাকবে বাংলাদেশ। কেউ রাস্তার পাশের দোকানে চা বানাবে। কেউ অফিসে যাওয়ার আগে টিভি খুলবে। কেউ মোবাইলে লাইভ স্কোর দেখবে। কেউ পুরোনো জার্সি পরে বসবে। আর যখন মেসি মাঠে নামবেন তখন সবার চোখ থাকবে আমেরিকার ক্যানসাস সিটি স্টেডিয়ামে। 

ফুটবল শেষ পর্যন্ত গোলের খেলা। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়। এটা আমাদের আবেগ। আমাদের বড় হয়ে ওঠার ছবি। যে প্রজন্ম মেসিকে দেখে বড় হয়েছে তারা এবার হয়তো মেসিকে শেষবারের মতো বিশ্বকাপে দেখবে। সেই দেখার মধ্যে আনন্দ আছে, ভয় আছে, নস্টালজিয়া আছে আর আছে এক গভীর ভালোবাসা।

প্রিয় মেসি, আপনি হয়তো জানেন না যে, আর্জেন্টিনা ছাড়াও হাজার মাইলের দুরত্বে একটা দেশ আছে, সেখানে আপনার জন্য মানুষ আবারও অপেক্ষা করছে। আপনার এক পাসের জন্য। এক হাসির জন্য। বলটা আপনার পায়ের ছোঁয়ার জন্য। এই বিশ্বকাপ যদি সত্যিই আপনার শেষ হয় তাহলে বাংলাদেশ আপনাকে শুধু বিদায় দেবে না। বাংলাদেশ আপনাকে মনে রাখবে অনেক রাতজাগা গল্পে। চোখের জল, চায়ের কাপ আর অসংখ্য অসমাপ্ত গল্পের ভেতর দিয়ে। 

আপনার শেষ বিশ্বকাপে তাই আবার জেগে উঠবে বাংলাদেশ।

বিষয় : বিশ্বকাপ ফুটবল লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা

The Campus Times online

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


মেসির শেষ বিশ্বকাপে আবার রাত জাগবে বাংলাদেশ

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে। এই সময়টাতে বাংলাদেশে রাত কখনো শুধু রাত থাকে না। ঘুমন্ত শহরের ভেতরেও তখন টেলিভিশনের আলো জ্বলে। চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে। যেদিকেই তাকাবেন কোথাও না কোথাও নীল-সাদা পতাকা দেখবেনই। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না কিন্তু বিশ্বকাপ এলে আমরা যেন অন্য এক মানচিত্রে ঢুকে পড়ি। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার রঙে ভাগ হয়ে যায় পাড়া, পরিবার, বন্ধুমহল, অফিস, ক্যাম্পাস, চায়ের দোকান।

এই বিশ্বকাপে সেই পুরোনো আবেগ আবার ফিরছে। কারণ মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনা তাদের বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে। ম্যাচটি হবে ক্যানসাস সিটিতে। ম্যাচের সময় ১৭ জুন ০১:০০ ইউটিসি। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা। অর্থাৎ এবার আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ দেখতে আমাদের রাতভর জেগে থাকতে হবে না। কিন্তু মেসির বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। তার আগে রয়েছে অনেক প্রস্তুতি। নতুন জার্সি কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, কিছু পুরনো পরিসংখ্যান ঘেঁটে নেওয়া, আগেভাগে সব কাজ সেরে রাখা। এসব মিলেই এক ধরনের রাতজাগা উৎসব। এই উৎসবের কেন্দ্রে একজন মানুষ। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

কয়েক দিনের মধ্যেই ৩৯ এ পা দেবেন মেসি। বলাই বাহুল্য, ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ প্রান্তে রয়েছেন এই ফুটবল জাদুকর। তবে মাঠে মেসির উপস্থিতি এখনো ফুটবলের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি। ২০০৬ সালে যে কিশোর মেসিকে বিশ্বকাপ প্রথম দেখেছিল ২০২৬ সালে সেই মানুষটি নামছেন রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে। ফুটবলে আরো অনেক তারকা আছে। কিন্তু একজন ফুটবলারের সাথে ভক্তদের এমন দীর্ঘ আবেগের সম্পর্কের উদাহরণ খুব কম। বাংলাদেশের ভক্তদের সাথে মেসির সম্পর্কটা আরো প্রগাঢ়। সেটা কেবল ফুটবলীয় নয়- ব্যক্তিগতও বটে।

আমাদের অনেকেই বেড়ে উঠেছি মেসিকে দেখে। রাতের পর রাত কেটেছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল তর্ক করে। প্রথম বেতন দিয়ে কিনেছি মেসির জার্সি। বাংলাদেশে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, মেসি আমাদের জীবনের সাথে মিশে থাকা একটা নাম যার সাথে আমরা বড় হয়েছি। 

২০১৪ সালের মারাকানার কান্না বাংলাদেশের অনেক ঘরে পৌঁছেছিল। সেদিন জার্মানির কাছে হেরে মেসি ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন। সেই ছবি যেন এক অসম্পূর্ণ কবিতার মতো থেকে গিয়েছিল কোটি মানুষের স্মৃতিতে। তারপর এল ২০২২। কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য ফাইনাল। ৩-৩, টাইব্রেকার, এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেভ, আর শেষে মেসির হাতে বিশ্বকাপ। যে মানুষটি প্রায় দুই দশক ধরে অপেক্ষা করছিলেন, তিনিই অবশেষে ট্রফি তুললেন। সেদিনও আমরা কেঁদেছি। এবার আনন্দে। বাংলাদেশে তখন রাত ছিল না, দিন ছিল না- ছিল শুধু নীল-সাদা আনন্দ।

কিন্তু এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আবেগ একটু আলাদা। এবার আর্জেন্টিনা শুধু বিশ্বকাপ খেলছে না তারা শিরোপা রক্ষার মিশনে নেমেছে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুইবার পুরুষদের বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আর্জেন্টিনার সামনে তাই ইতিহাসের কঠিন দরজা। স্কালোনির দল ২০২২ সালের অনেক চেনা মুখ নিয়েই এসেছে। মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, রোমেরো, দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজরা আছেন। আবার নতুন প্রজন্মের কয়েকজনও আছে যারা হয়তো মেসির পরের আর্জেন্টিনার গল্প লিখবে। তবে বাংলাদেশের চোখ থাকবে মেসিতে।

কারণ মেসি যখন বল পায়ে নেন তখন ফুটবলটা কিছুক্ষণের জন্য ধীর হয়ে যায়। তিনি সব সময় দৌড়ে ম্যাচ জেতান না। তিনি কখনো হাঁটেন, কখনো দেখেন, কখনো অপেক্ষা করেন। তারপর হঠাৎ বলটা পেয়ে যান। এরপরই নেন একটা টার্ন, চোখের পলকে ফাঁক গলে বের হয়ে যান। বাম পায়ের স্পর্শে পুরো মাঠের মানে বদলে দেন। নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা অনেক গতি দিয়ে খেলেন। অনেক শক্তি দিয়ে খেলেন। কিন্তু মেসির খেলায় এখনো একটা পুরনো দিনের শিল্প আছে। তিনি যেন ফুটবলের শেষ বড় কবিদের একজন।

বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-ভালোবাসার ইতিহাসও দীর্ঘ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপ এই দেশে আর্জেন্টিনা-আবেগের বড় ভিত্তি তৈরি করেছিল। তারপর মেসি সেই আবেগকে নতুন প্রজন্মের কাছে নিয়ে এসেছেন। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা যখন নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে মেসিকে দেখার জন্য বাংলাদেশে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল তা এখনো অনেকের স্মৃতিতে আছে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভালোবাসা এতটাই আলোচিত হয় যে ৪৫ বছর পর ঢাকায় আবার আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু হওয়ার ঘটনাতেও এই ফুটবল-আবেগকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এটাই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। এখানে মেসি কখনো শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নন। তিনি রংপুরের কোনো চায়ের দোকানের পোস্টার, পুরান ঢাকার কোনো ছাদের পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রাতজাগা আড্ডা, ছোট্ট শিশুর নীল-সাদা জার্সি, আর অফিস শেষে ক্লান্ত মানুষের ভোরবেলার অপেক্ষা।

এই বিশ্বকাপ হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো নয়। ফুটবল কখনো নিশ্চিত কথা বলে না। কিন্তু বয়স, সময়, শরীর, ইতিহাস- সব মিলিয়ে আমরা জানি এবারের বিশ্বকাপই হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। ২০২২ সালের মেসিকে আমরা দেখেছিলাম পূর্ণতার পথে। ২০২৬ সালের মেসিকে আমরা দেখছি বিদায়ের আলোয় দাঁড়িয়ে। তিনি জিতবেন নাকি জিতবেন না, গোল পাবেন নাকি পাবেন না, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারবে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত- বাংলাদেশ আবার মেসির জন্য অপেক্ষা করবে। 

কারণ মেসি আমাদের অনেক রাত জাগিয়েছেন। অনেক হতাশা দিয়েছেন। অসম্ভব আনন্দও দিয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন বারবার হারলেও গল্প শেষ হয় না। ২০১৪ সালের কান্না ২০২২ সালের হাসিতে বদলে যেতে পারে। নীরব স্বভাব আর অল্প কথার মানুষও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে সবচেয়ে বড় উত্তর দিতে পারেন। মেসির ক্যারিয়ারটা তাই কেবল প্রতিভার গল্প নয়। মেসির গল্পটা অপেক্ষা, ধৈর্য, বিনয় আর অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করার।

বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কখনো বুয়েনস আইরেস দেখেনি। রোসারিওর পথ চেনে না। আর্জেন্টিনার ভাষা জানে না। তবু মেসি গোল করলে এই দেশে মানুষ চিৎকার করে ওঠে। আর্জেন্টিনা হারলে আমাদেরও মন খারাপ হয়। মেসি হাঁটলে কেউ ভাবে তিনি ক্লান্ত কি না। মেসি হাসলে মনে হয় নিজের ঘরের কেউ ভালো আছে।

এই অনুভূতির কোনো নাম নেই। কোনো মানে নেই। 

তাই আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ নয়। এটি বাংলাদেশের মেসি-অধ্যায়ের আরেকটি সকাল। রাতভর না জাগলেও, আবেগে জেগে থাকবে বাংলাদেশ। কেউ রাস্তার পাশের দোকানে চা বানাবে। কেউ অফিসে যাওয়ার আগে টিভি খুলবে। কেউ মোবাইলে লাইভ স্কোর দেখবে। কেউ পুরোনো জার্সি পরে বসবে। আর যখন মেসি মাঠে নামবেন তখন সবার চোখ থাকবে আমেরিকার ক্যানসাস সিটি স্টেডিয়ামে। 

ফুটবল শেষ পর্যন্ত গোলের খেলা। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়। এটা আমাদের আবেগ। আমাদের বড় হয়ে ওঠার ছবি। যে প্রজন্ম মেসিকে দেখে বড় হয়েছে তারা এবার হয়তো মেসিকে শেষবারের মতো বিশ্বকাপে দেখবে। সেই দেখার মধ্যে আনন্দ আছে, ভয় আছে, নস্টালজিয়া আছে আর আছে এক গভীর ভালোবাসা।

প্রিয় মেসি, আপনি হয়তো জানেন না যে, আর্জেন্টিনা ছাড়াও হাজার মাইলের দুরত্বে একটা দেশ আছে, সেখানে আপনার জন্য মানুষ আবারও অপেক্ষা করছে। আপনার এক পাসের জন্য। এক হাসির জন্য। বলটা আপনার পায়ের ছোঁয়ার জন্য। এই বিশ্বকাপ যদি সত্যিই আপনার শেষ হয় তাহলে বাংলাদেশ আপনাকে শুধু বিদায় দেবে না। বাংলাদেশ আপনাকে মনে রাখবে অনেক রাতজাগা গল্পে। চোখের জল, চায়ের কাপ আর অসংখ্য অসমাপ্ত গল্পের ভেতর দিয়ে। 

আপনার শেষ বিশ্বকাপে তাই আবার জেগে উঠবে বাংলাদেশ।


The Campus Times online

সাধারণ সম্পাদক: মোঃ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মোঃ সেলিম রেজা (বিএ, অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক্যাম্পাস টাইমস অনলাইন
মেসির শেষ বিশ্বকাপে আবার রাত জাগবে বাংলাদেশ
0:00 0:00
1.0x